সংগ্রামী শ্রমিকনেতা বাদশা মিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনী ও পারিবারিক পরিচিতি
বাদশা মিয়ার জন্ম ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ-এ রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থানার ১৫ নং বড় হযরতপুর ইউনিয়নের দুবলাচারী লতিফপুর গ্রামে। পিতা ফকির মুহাম্মদ, মাতা আনোয়ারা বেগম। পরিবারিক শ্রেণীগত অবস্থান খেতমজুর। পরিবারের অন্যান্য সদস্যের মধ্যে তার স্ত্রী, এক কন্যা, পাঁচ ভাই ও তিন বোন। ছোটবেলায় মা মারা যাওয়ায় অভাব-অনাটনে পরিবার জীবন অতিবাহিত হওয়ায় অন্যের বাড়িতে রাখালের কাজ করেই জীবনযুদ্ধ শুরু। সৎ মায়ের কারণে সংসারে বনিবনা না হওয়ায় এক সময় এক কাপড়ই ঢাকায় চলে আসেন। কিছুদিন তৃণমূল মানুষের সাথে থাকা হকার হিসাবে কাজ করেন। চাঁদাবাজদের খারাপ ভাষা, মাস্তানদের হয়রানিসহ নানান অনিয়মে বাদশা মিয়া প্রতিবাদী হন। বেশি দিন হকারি করত মন সায় না দেওয়ায় হকারি ছেড়ে হোটেলে কাজ নিলেন গ্লাসবয় হিসেবে। কাস্টমারদের গালাগালি, মালিকের অত্যাচার, লাঠিপেটা তাকে আরও প্রতিবাদী করে তোলে। শ্রমিকের মুখেই শুনতে পান যে, শ্রমিকদের নাকি সংগঠন আছে। প্রতিবাদী বাদশা মিয়া যোগ দেন ঢাকা মহানগরী হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সাংগঠনিক কাজে। আর পিছনে ফেলা নয়, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এটাকেই আপন করে নিলেন সকল আরাম-আয়েশ, সংসার, পরিবার-পরিজন সকল কিছু থেকে সংগঠনকেই বেশি ভালবাসলেন। শ্রমিকদের ভালোবাসায় নিজেকে উৎসর্গ করলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এটাই হলো তার পথ চলার একমাত্র অবলম্বন। ঢাকার
সুদক্ষ রুটির কারিগর বাদশা মিয়ার আর দশজনের মত কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না, রাজনৈতিক ও স্বশিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। ঢাকা মহানগরী হোটেল শ্রমিক ইউনিয়ন-এর প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ের পর থেকেই কর্মী পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তৎকালীন সময়ে ঢাকা মহানগরী হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক সোলায়মান মুন্সির অনিয়ম, সংগঠনের স্বার্থ ও আদর্শ বিরোধী তৎপরতার বিরুদ্ধে লাগাতার এবং ধারাবাহিক সংগ্রামে দৃষ্টান্তকারী ব্যক্তিত্ব বাদশা মিয়া। বাংলাদেশ হোটেল শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফন্ট ঢাকা মহানগর কমিটির সাবেক সহ-সভাপতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি। সমকালীন নৌযান শ্রমিক ফেডারেশনের ধর্মঘটসহ নানান কর্মসূচিতে সাহসিকতার সাথে নেতৃত্ব প্রদান এবং পুরান ঢাকা সদর ঘাট লঞ্চ টার্মিনালে মাস্তানদের সাথে সাহসিকতার সাথে ভূমিকা রেখেছেন। তিনি ধ্রুবতারা সাংস্কৃতিক সংসদের আহ্বানেও নায়স্কৃতিক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ত হন, লাশ বিপনী নামে একটি নাটকেও অভিনয় করেন। কৃষক সংগ্রাম সমিতির বিভিন্ন অঞ্চলে সমাবেশ, সম্মেলনে বক্তব্য রাখতেন। এছাড়াও হকারদের সভা, সমাবেশ ও সংগ্রামের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের লড়াইকে আপন করে নিয়ে তাকে অগ্রসর করেন। দক্ষতা, যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতার সাথে মানুষের মাঝে মেশার অসীম যোগ্যতা ছিল তার। অত্যন্ত মানবিক গুণ সম্পন্ন মানুষ ছিলেন বাদশা মিয়ার।
২৯ জুন ১৯৯৪ তারিখে ঢাকা মহানগরী হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নের সবুজবাগ থানা কমিটি গঠনের লক্ষ্যে কর্মী সভায় বক্তব্য দেন। সে দিন দীর্ঘ মিছিলে লাগাতার স্লোগান এবং কর্মসূচির শেষ করে বাসায় চলে যান। পরদিন সকালে খবর আসে বাদশা মিয়া আর নেই, তিনি মারা গেছেন। ওই সময় মোবাইল ছিল না। কিন্তু সেদিন ৩০ জুন ভোর থেকেই মানুষের মুখে মুখে মানিকনগর অঞ্চলে যারাই বসবাস করতেন তাদের মুখে শোনার মধ্যদিয়েই সংগঠন বাদশা মিয়ার মৃত্যু সংবাদ পায়।
আজ ৩০ জুন ২০২৬ মঙ্গলবার বাদশা মিয়ার ৩২তম মৃত্যুবার্ষিকী ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে তোপখানার শিশু কল্যাণ পরিষদ হলে (মিলনায়তনে) আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। এ আলোচনা সভায় ঢাকার সেই আশির দশক থেকে যারা সংগঠন-সংগ্রামের সাথে সম্পৃক্ত আছেন বা ছিলেন তাদের অনেকেই আসবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। বাদশা মিয়ার জীবনী নিয়ে কথা বলবেন, শ্রমিকদের আগামী দিনের লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা যোগাবেন।
আসুন আজকের আলোচনা সভা থেকে আমরা শিক্ষা নেই কর্মময় জীবন সম্পর্কে নিজ কানে শুনি আত্মস্থ করি, নিজেকে সজ্জিত করি সংগ্রামী প্রেরণায়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াইয়ে আমাদের একমাত্র পথ- বাদশা মিয়াদের রেখে যাওয়া পথই- আমাদের মুক্তির পথ।







