জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে তামাকজাত দ্রব্যে সুনির্দিষ্ট করারোপের বিকল্প নেই
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে আসন্ন অর্থবছরে তামাকজাত দ্রব্যে অ্যাড ভেলোরেম সম্পূরক শুল্কের পাশাপাশি অতিরিক্ত সুনির্দিষ্ট করারোপের কোনো বিকল্প নেই। কারণ বর্তমানে যে কর হার রয়েছে সেটা যথেষ্ট এবং অত্যন্ত যৌক্তিক। কিন্তু কর হার না বাড়িয়ে শুধু দাম বাড়ালে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে না। বরং কোম্পানির মুনাফা আরও বেড়ে যাবে। ফলে অ্যাড ভেলোরেমের পাশাপাশি যে হারেই হোক, সুনির্দিষ্ট করারোপ করা জরুরি বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য ড. সাইমা হক বিদিশা।
আজ শনিবার (২৩ মে ২০২৬) সকাল ১০টায় রাজধানীর সেগুনবাগিচায় বিএমএ ভবনের ডা. মিলন সভাকক্ষে “জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর তামাক কর কাঠামো” শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে আসন্ন অর্থবছরের তামাক কর প্রস্তাব ও মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এসএম আব্দুল্লাহ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য প্রিমিয়াম স্তরে ২০০ টাকা, উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা এবং মধ্যম ও নিম্ন স্তরকে একীভূত করে তাতে ১০০ টাকা নির্ধারণ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সব স্তরে ৬৭% সম্পূরক শুল্ক বহাল রাখা এবং প্রতি ১০ শলাকায় অতিরিক্ত ৪ টাকা “সুনির্দিষ্ট সম্পুরক শুল্ক” আরোপ করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি প্রিমিয়াম স্তর ব্যাতিত অন্য স্তরসমূহের মূল্য থেকে “ও তদূর্ধ” শব্দদ্বয় বাদ দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
বিড়ির কর প্রস্তাবে ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন বিভাজন তুলে দিয়ে সুনির্দিষ্ট শুল্ক ব্যবস্থার প্রচলনসহ ২০ শলাকার সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ করে ৫০% সম্পুরক শুল্ক আরোপের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া জর্দা ও গুলের ওপর সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থার প্রচলনসহ প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৬০ টাকা এবং প্রতি ১০ গ্রাম গুলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ করে উভয় ক্ষেত্রে ৬০%সম্পূরক শুল্ক নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে। উভয় পণ্যের ওপর আরোপিত সুনির্দিষ্ট সম্পূরক শুল্কের পরিমাণ এনবিআরকে নির্ধারণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এছাড়া সকল তামাকজাত দ্রব্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের ওপর ১৫% মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং ১% স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তামাক পাতা রপ্তানিতে ২৫% রপ্তানি শুল্ক পুনর্বহালের প্রস্তাব করেছেন তারা।
গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক, বিইআরের তামাক কর প্রকল্পের ফোকাল পার্সন ও বিএনটিটিপির টেকনিক্যাল কমিটির আহ্বায়ক ড. রুমানা হক। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সিনিয়র সচিব, ডিপিডিসির চেয়ারম্যান হামিদুর রহমান খান। এছাড়া বিশেষজ্ঞ আলোচক ছিলেন, বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদ। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএনটিটিপি’র প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল এবং সঞ্চালনা করেন বিএনটিটিপি’র সিনিয়র কমিউনিকেশন অফিসার ইব্রাহীম খলিল।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মো. এনামুল হক বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে সরকারের দ্রুত একটি জাতীয় কর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা জরুরি। তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য এটি একটি গাইডলাইন হিসেবে কাজ করবে। তবে প্রস্তাবিত কর প্রস্তাবটি কার্যকর করা হলে প্রায় ৫ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ী ধূমপান ত্যাগ করতে উৎসাহিত হবে এবং ৩ লক্ষ ৭২ হাজারেরও বেশি তরুণ ধূমপান শুরু করা থেকে বিরত থাকবে। ধোঁয়াবিহীন তামাকের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে।
হামিদুর রহমান খান বলেন, তামাক কোম্পানিগুলো প্রাণঘাতী পণ্যের ব্যবসা করে বিপুল মুনাফা করে। তারা তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে মিথ্যা তথ্য ছড়ায়। সরকারের উচিৎ একটি টেকসই তামাক কর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একটি কমপ্রিহেন্সিভ তামাক কর নীতি প্রণয়ন করা।
বাংলাদেশ কৃষি সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আবু খালিদ বলেন, দেশে তামাকের চাষ ও উৎপাদন আগের চেয়ে বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ জরুরি। তামাক চাষের কারণে পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ক্ষতি বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজস্ব ফাঁকিও বাড়ছে। সবমিলিয়ে দেশে তামাক চাষের কারণে বছরে দেড় লাখ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
ড. রুমানা হক বলেন, সরকার খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে। কিন্তু তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য ও কর হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নানা ধরনের টালবাহানা করে। আদালতের আদেশ অমান্য করে দেশে নতুন করে ই-সিগারেট ও নিকোটিন পাউচের অনুমতি দেয়ার চেষ্টা চলছে। এই সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ পরিনতি নিয়ে আসবে। তিনি সরকারকে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।





