শিল্পকলা একাডেমির ‘অঘোষিত সম্রাট’ জিএম জাকিরের পাহাড়সম দুর্নীতি: বরখাস্ত না করে নওগাঁয় বদলি নিয়ে ক্ষোভ
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে গত কয়েক বছর ধরে জেঁকে বসা এক ‘অঘোষিত সম্রাট’ ও দুর্নীতির বরপুত্রকে ঘিরে একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। তিনি আর কেউ নন, একাডেমির প্রশাসন বিভাগের সাবেক উপপরিচালক জিএম জাকির হোসেন। সাবেক স্বৈরাচারী মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর অতি-ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুবাদে এবং তৎকালীন আওয়ামী ক্ষমতার দাপট খাটিয়ে জাতীয় এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি নিজের ব্যক্তিগত দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছিলেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন, বদলি-পদোন্নতি বাণিজ্য এবং নারী সহকর্মী ও শিল্পীদের যৌন নিপীড়নের মতো লোমহর্ষক সব তথ্য এখন প্রকাশ্যে। সর্বশেষ গত ১৫ই জুন ২০২৬ তারিখে সংস্কৃতি কর্মী উজ্জল পারভেজের এক গুচ্ছ গুরুতর লিখিত অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ই জুলাই তাকে শাস্তিমূলক বরখাস্তের পরিবর্তে কেবল নওগাঁয় বদলি করায় সাধারণ শিল্পী ও কর্মচারীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
অফিস রুমে গানের আসর ও চরম নৈতিক স্খলনঃ
অভিযোগ রয়েছে, জাকির হোসেন প্রশাসন বিভাগে নিজের অফিস কক্ষকে ব্যক্তিগত গান শেখানোর কোচিং সেন্টারে রূপান্তর করেছিলেন। সেখানে টিউশন করানোর আড়ালে তিনি বিভিন্ন নারীকে অনৈতিক প্রস্তাব দিতেন। সম্প্রতি এক নারী শিল্পীকে ফেসবুক মেসেঞ্জারে আপত্তিকর কুপ্রস্তাব দেওয়ায় কার্যালয়ের ভেতরেই তাকে জনসম্মুখে জুতাপেটা ও চড়-থাপ্পড় মারার ঘটনাও ঘটে, যা শিল্পী মহলে ব্যাপক চাউর রয়েছে। কোনো নারী এসব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করলে জাকিরের শক্তিশালী সিন্ডিকেট তাকে ভয়ভীতি ও মিথ্যা মামলার হুমকি দিতো। এমনকি তার কক্ষে সিসিটিভি ক্যামেরা ও অডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে নারী শিল্পীদের ফাঁদে ফেলার অপচেষ্টাও চলতো।
শতকোটি টাকার অবৈধ সম্পদ ও কোটি টাকার স্টুডিও লুটঃ
দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে থাকার সুবাদে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে জিএম জাকির বর্তমানে বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক। রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট (যার মধ্যে আজিমপুরে ১টি ব্যক্তিগত ফ্ল্যাট এবং আগারগাঁওয়ে ৬০ ফিট এ ৫ তলায় ১টি ফ্ল্যাট), পূর্বাচলে প্লট এবং নামি-দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি রয়েছে তার। এছাড়া স্ত্রী ও সন্তানদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে কোটি কোটি টাকার এফডিআর (FDR) ও সঞ্চয়পত্র রয়েছে। শুধু তাই নয়, একাডেমির কোটি টাকা মূল্যের একটি স্টুডিওর মালামাল আত্মসাৎ করে নিজের ব্যক্তিগত অফিস ও বাসভবনে ব্যবহার করার মতো গুরুতর চুরির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
৩০ কোটি টাকা গায়েবের চেষ্টা ও চেক জালিয়াতিঃ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৎকালীন উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তার তথ্যমতে, জিএম জাকির হোসেন কোনো প্রকার অনুষ্ঠান আয়োজন ছাড়াই একাডেমির ফান্ড থেকে প্রায় ৩০ কোটি টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে গায়েব করার নীল নকশা করেছিলেন। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তাতে রাজি না হওয়ায় তাকে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়। এছাড়া শিল্পীদের নামে বরাদ্দকৃত চেকের টাকা তিনি নিজেই জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন বলেও প্রমাণ পাওয়া গেছে। সাবেক মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সময়ে ১০০টি সিডি করার নামে ৩৩ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করে সেই অর্থ দিয়ে ফ্ল্যাট কেনার অভিযোগও রয়েছে তার নামে।
বদলি-পদোন্নতির কোটি টাকার শক্তিশালী সিন্ডিকেটঃ
একাডেমিতে জাকির হোসেন এক বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। তার এই চক্রের প্রধান সহযোগী হিসেবে নাম এসেছে শিল্পকলা একাডেমির সচিব এর পি এস সুমন মিয়া, অফিস সুপার আসমা বেগম (সুমন মিয়ার স্ত্রী), সাবেক উপ-পরিচালক (অর্থ) সরকার জিয়াউদ্দিন আহমেদ বিপ্লব এবং প্রশাসন বিভাগের কষ্টিউম ডিজাইনার কামরুন্নাহার সৃষ্টি (বর্তমানে প্রশিক্ষণ বিভাগের কোর্স-কো-অর্ডিনেটর) এর নাম।। এই চক্রের মাধ্যমে বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হতো। এমনকি তদন্ত কমিটির সদস্য থাকাকালীন অর্থের বিনিময়ে অপরাধী কর্মকর্তাদের দায়মুক্তি দিয়ে তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। বর্তমানে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর নিজেকে ‘জাতীয়তাবাদী দলের’ লোক দাবি করে ভোল পাল্টানোর অপচেষ্টাও চালাচ্ছেন এই চতুর কর্মকর্তা।
বরখাস্তের পরিবর্তে নওগাঁয় বদলি: ক্ষুব্ধ সংস্কৃতি মহলঃ
জাকিরের এই পাহাড়সম অপরাধের পাহাড় থাকার পরও তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি বা বিভাগীয় ব্যবস্থা না নিয়ে কেবল ঢাকার বাইরে নওগাঁয় বদলি করায় ক্ষোভের ঝড় উঠেছে। গত ৫ই জুলাই ২০২৬ তারিখে এক অফিস আদেশে তাকে বদলি করা হয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বর্তমান মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, “অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমার উপর মহলকে অবগত করে তাকে বদলি করেছি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে যে সুপারিশ করবে, আমরা ভবিষ্যতে সেই সুপারিশ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করব।”
সংস্কৃতি কর্মী ও সাধারণ শিল্পীদের জোর দাবি, জাতীয় পর্যায়ের এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও কাজের পরিবেশ রক্ষা করতে এই ‘অসৎ ও দুর্নীতিবাজ’ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। একই সাথে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মাধ্যমে নিবিড় তদন্তের মাধ্যমে তার এই বিপুল অবৈধ সম্পদের রহস্য উন্মোচন করে তাকে আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সকলে।







