বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপন উপলক্ষে আদিবাসী নারীদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপন উপলক্ষে আদিবাসী নারীদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
মত বিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু; লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক ফাল্গুনী ত্রিপুরা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এএলএআরডি’র উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি; দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট-বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রশান্ত ত্রিপুরা; মানবাধিকার কর্মী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য দীপায়ন খীসা। উপস্থিত আদিবাসী প্রতিনিধিবৃন্দের মধ্যে মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র পরিষদের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক জানকী চিসিম; বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের মনিরা ত্রিপুরা; হিল উইমেন্স ফেডারেশনের শান্তিদেবী তঞ্চজ্ঞা; স্টেপসের চন্দন লাহিড়ী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা ও লিগ্যাল এইড অফিসার সিনো মে মারমা। উক্ত মতবিনিময় সভায় উইমেন্স ফেডারেশন, গারো ছাত্র ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের প্রতিনিধিসহ বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা মহানগর কমিটির নেত্রীবৃন্দ, সম্পাদকমন্ডলী, কর্মকর্তাগণ সহ প্রায় আশি জন উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড অফিসার সিননোমে মারমা (সিনো)।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ত্রিপুরা আদিবাসীদের কাথারক নৃত্য পরিবেশন করেন রেনি ত্রিপুরা,প্রহেলিকা ত্রিপুরা এবং ধীরা ত্রিপুরা।
লিখিত বক্তব্যে বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমস্বয়ক ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, আদিবাসীদের যে বর্ণিল ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় এর পিছনে থাকা নারীদের সংগ্রামী জীবনের দিকটি উপস্থাপিত হয়না। প্রায়ই ভ’মি দখলকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিভিন্ন অরাজকতায় আদিবাসী নারীরা প্রধান টার্গেট হয়ে থাকে। তিনি এসময় আদিবাসী নারীদের ভূমি ও সম্পত্তির অধিকার, সহিংসতা, বিচারপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। পাশাপাশি আদিবাসী নারীদের বৈষম্য দূর করতে নারী অধিকার, আদিবাসী অধিকার, ভূমি অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এই চারটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ।
একইসঙ্গে সহিংসতা প্রতিরোধ, ক্ষতিপূরণ ও আইনি সহায়তা, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন, ভূমি কমিশন, মাতৃভাষায় শিক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় নীতি ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় আদিবাসী নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতসহ ১১ দফা দাবি উপস্থাপন করেন।
মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন আদিবাসীদের সংস্কৃতির ধারক বলা হয়। তবে ক্রমশই আমাদের বিভিন্ন শ্রেনী গোষ্ঠীর পরিসর ছোট হয়ে আসছে। আন্ত: যোগাযোগ কমে আসছে। গারো অধিবাসী অদ্ধুষিত এলাকায় গারো নারীরা নিরাপদ নয়; মব সহিংসতা ঘটলেও প্রতিরোধের উপায় নেই। গণমাধ্যমে আদিবাসীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়। আদিবাসী কোন নারী ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর থানায় মামলা করতে গেলে হয়রানির শিকার হতে হয় বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে।এটি পরিবর্তিত না হলে আদিবাসী সহ কোন নারীই বিচার পাবেনা। তারা এসময় প্রান্তিক আদিবাসী নারীদের নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি ঢাকা শহরে থাকা আদিবাসী নারীদের জন্য কাজ করার আহ্বান জানান। বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে পরষ্পরের যোগাযোগ কে কিভাবে একসূত্রে বাধা যায় সেবিষয়ে কাজ করার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
মুক্ত আলোচনা শেষে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এএলএআরডি’র উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি বলেন, জাতিগতভাবে আমরা আস্থার সংকটে ভুগছি। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার বাস্তবায়নের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রশান্ত ত্রিপুরা বলেন, আদিবাসীদের অধিকারের প্রশ্নে কাজ করা অনেকের মধ্যে এখনো বৈষম্যমূলক পক্ষপাত দেখা যায়। জাতিসংঘ আদিবাসী দিবস ঘোষণা করেছে ঠিকই তবে আদিবাসীদের প্রান্তিক হিসেবেই চিহ্নিত করে। আদিবাসী ইস্যূতে রাষ্ট্রের যে অনীহা দেখা যায় সেটি প্রতিটি শাসনামলেই রয়েছে। ক্ষমতায় আসার আগে আদিবাসীদের কল্যাণে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হলেও বাস্তবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয়না। বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষার কোন স্বীকৃতি নেই।
মানবাধিকার কর্মী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, উচ্চপদে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেই নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি পেয়েছে এটি বলা যাবেনা। একটি নারীবিরোধী সংস্কৃতির মধ্যে বসবাস করছি।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, এবারের বিশ^ আদিবাসী প্রতিপাদ্যে আদিবাসি জ্ঞানকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে তবে এটিকে সম্মান করা হচ্ছেনা। যুগ যুগ ধরে অসমতার জন্য আন্দোলনের যে চাকা চলছিলো তাকে ঘুরিয়ে দেয়ার চেষ্টা চলছে, অস্তিত্ব রক্ষা ও অগ্রসর হওয়ার এই দুইটি বিষয়ে আমাদের একসাথে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। নানামুখী পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে আদিবাসী আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি আলাদা আলাদাভাবে ইস্যূভিত্তিক আলোচনার উপরও গুরুত্বারোপ করেন।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশে প্রায় ৫৪টিরও বেশি পাহাড়ি ও সমতলীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠী তাঁদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, ঐতিহ্য, ভাষা, জ্ঞান এবং গভীর জীবনবোধ নিয়ে বসবাস করছেন। আদিবাসীদের এই গৌরবময় অস্তিত্ব কেবল তাঁদের নিজস্ব পরিচয় নয়, বরং এটি আমাদের সমগ্র দেশের এক অমূল্য সম্পদ এবং অহংকার। আদিবাসী নারীদের জীবন এই ভূমির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তাঁরা অত্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের জন্য জ্বালানি সংগ্রহ করেন, জুম বা কৃষি কাজ করেন এবং নিজেদের জীবিকা নির্বাহের জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছেন। কিন্তু অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করা যাচ্ছে , আজ আদিবাসী নারীরা অত্যন্ত প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছেন।একদিকে নারী হিসেবে এবং অন্যদিকে আদিবাসী হিসেবে তাঁরা দ্বিগুণ বৈষম্য, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। সভ্যতার ও উন্নয়নের নামে তাঁদের পরম যতেœ আগলে রাখা ভূমির ওপর আগ্রাসন চালানো হচ্ছে, তাঁদেরকে নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার এবং নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই প্রতিকূলতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধের লড়াইয়ে আদিবাসীসহ সকলকে একত্রিত হয়ে একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। পাশাপাশি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায়, মূলধারার নারী আন্দোলনকে তাঁদের দাবির সাথে সম্পৃক্ত করার উপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।







