প্রযুক্তি-নির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বন্ধে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের দাবি
প্রযুক্তি-নির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বন্ধে সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের দাবি
অনলাইনে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তি-নির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা (TFGBV) প্রতিরোধে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৩ সংস্কারের দাবি জানিয়েছে মাল্টিপার্টি অ্যাডভোকেসি ফোরাম (ম্যাফ), ঢাকা। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা, দ্রুত বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে একগুচ্ছ সুপারিশমালা পেশ করা হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
অনলাইন সহিংসতার উদ্বেগজনক চিত্র
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমানে ডিজিটাল স্পেসে নারীদের উপস্থিতি বাড়লেও নিরাপত্তা চরম হুমকিতে রয়েছে। অনুমোদিত ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়া, ডিপফেক, যৌন হয়রানি, সাইবারস্টকিং, ডক্সিং, সাইবার ট্রলিং ও অনলাইন বুলিংয়ের মাধ্যমে নারীদের সামাজিকভাবে হেয় করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’-এর তথ্য উদ্ধৃত করে সম্মেলনে জানানো হয়, ৮ শতাংশ নারী জেন্ডারভিত্তিক সাইবার সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীরা।
অন্যদিকে, পুলিশ সাইবার সাপোর্ট ফর উইমেন (PCSW)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৬০,৮০৩ জন নারী সহায়তার জন্য আবেদন করেছেন। যার মধ্যে ৯১ শতাংশ অভিযোগই ছিল অনলাইন সহিংসতা-সংক্রান্ত।
আইনি সীমাবদ্ধতা ও বাস্তবতার সংকট
বক্তারা বলেন, সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৩-এ বেশ কিছু অপরাধের সংজ্ঞা অস্পষ্ট। ডিপফেক, সাইবারস্টকিং, ডক্সিং ও দলবদ্ধ অনলাইন হয়রানির বিষয়ে আইনে সুস্পষ্ট বিধান বা বিচারিক প্রক্রিয়া নেই। তদ্ব্যতীত, ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা, আলামত সংরক্ষণ, দ্রুত তদন্ত এবং আদালত বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্দিষ্ট দায়-দায়িত্ব নির্ধারণের বিষয়েও ঘাটতি রয়েছে।
ম্যাফ, ঢাকার ৫ দফা সুপারিশ
TFGBV প্রতিরোধে ম্যাফ, ঢাকা-এর পক্ষ থেকে আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন ও বাস্তবায়নে মূলত ৫টি প্রধান সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়:
১. TFGBV-এর পরিষ্কার আইনি স্বীকৃতি: আইনে প্রযুক্তি-নির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার স্পষ্ট সংজ্ঞা দিতে হবে। ‘সম্মতি’ (Consent)-র ধারণা পরিষ্কার করে ভিডিও/ছবি ধারণ ও প্রচারের আইনি অপরাধ নির্ধারণ করতে হবে।
২. নতুন ধরনের সহিংসতার শাস্তি: ডিপফেক, যৌন হয়রানি, সাইবারস্টকিং ও ডক্সিংকে স্পষ্ট অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে শাস্তির সুনির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করতে হবে।
৩. ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সুরক্ষা ও বিচার: ভুক্তভোগীর পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা, আইনি ও মানসিক সহায়তা দান এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
৪. দ্রুত সহায়তা ও কার্যকর তদন্ত: ডিজিটাল প্রমাণ সংরক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করা এবং আদালতের মাধ্যমে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
৫. ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহিতা: সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ও অন্যান্য ডিজিটাল সার্ভিস প্রোভাইডারদের জন্য আইনি জবাবদিহিতা ও নিয়মিত রিপোর্টিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ গণমাধ্যমকর্মী ও সংবাদ মাধ্যমের প্রতি স্পর্শকাতর দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান। তাঁরা বলেন, সংবাদের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর ছবি, পরিচয় ও স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে সংবাদ প্রকাশ নতুন কোনো হয়রানির কারণ না হয়।
একটি নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জেন্ডার-সংবেদনশীল ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার, সুশীল সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়।







