বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে সারাদেশে নারীর প্রতি অব্যাহত সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা ও শিশু হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে সারাদেশে নারীর প্রতি অব্যাহত সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা ও শিশু হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত ।
আজ ১৬ আগস্ট ২০২৬ (রবিবার) বিকাল ৩:৩০ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে সারাদেশে অব্যাহত নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা ও শিশু হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত মানববন্ধন কর্মসূচি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সকল জেলা শাখায় আজ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাসুদা রেহানা বেগম; আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি; ঢাকা মহানগর কমিটির লিগ্যাল এইড সম্পাদক শামীমা আফরোজ আইরীন; সাংগঠনিক সম্পাদক কানিজ ফাতেমা টগর এবং কেন্দ্রীয় কমিটির লিগ্যাল অ্যাডভোকেসি ও লবি পরিচালক অ্যাড. দীপ্তি শিকদার। কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রোগ্রাম অফিসার সিজুল ইসলাম, ঢাকা ওয়াইডব্লিউ সিএ অব বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার। আরো উপস্থিত ছিলেন অভিযান ও ব্র্যাক বিশ^বিদ্যালয়ের প্রতিনিধি। উক্ত মানববন্ধন কর্মসূচিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা মহানগর কমিটির নেত্রীবৃন্দ, সম্পাদকমন্ডলী, কর্মকর্তাগণ এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ সহ প্রায় শতাধিক জন উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচি পরিচালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেটওয়ার্কিং ও অ্যাডভোকেসি পরিচালক জনা গোস্বামী।

সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, আমাদের হাতে যে তথ্য-উপাত্ত এসেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, গত সাত মাসে ৮৩ জন কন্যাশিশু ও ২৫৮ জন নারী হত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ টি ঘটনা ধর্ষণ ও ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যান্য হত্যাকান্ডের পেছনে রয়েছে জমিজমা নিয়ে বিরোধ, মামলা-মোকদ্দমা, পারিবারিক বিরোধসহ বিভিন্ন কারণ। কিন্তু এটি শুধু হত্যার সংখ্যা নয়; হত্যার ধরণ ও নৃশংসতাও আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করছে।” তিনি বলেন, “আমরা যে তথ্য পাচ্ছি, তা মূলত সীমিতসংখ্যক সংবাদপত্রের প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত। মাত্র ১৪টি পত্রিকার তথ্যের ভিত্তিতে এই চিত্র পাওয়া গেছে। অথচ দেশে আরও অসংখ্য সংবাদমাধ্যম রয়েছে। সব সংবাদমাধ্যমের তথ্য যদি আমাদের হাতে আসত, তাহলে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে বাংলাদেশে নারীর নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার কতটা নিশ্চিত?” তিনি আরও বলেন, “সমাজে বৈষম্য দূর করতে হলে শুধু বৈষম্য কমেছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা করলেই হবে না; বৈষম্যের প্রবণতা ও এর কাঠামোগত কারণগুলোও বিবেচনা করতে হবে। নারীসহ সমাজের সকল মানুষের মানবাধিকার নিশ্চিত করা এবং বৈষম্য দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।” তিনি এসময় দৃঢ়ভাবে বলেন, “নারীদের ভয় দেখিয়ে ঘরে ফেরানো যাবে না। নারীরা তাদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত থাকবে। নারী হত্যা ও সহিংসতার বিরুদ্ধে আমরা সোচ্চার থাকব এবং এমন একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য কাজ করব, যেখানে নারীকে হত্যা, ধর্ষণ বা নির্যাতনের শিকার হতে হবে না।” তিনি বলেন, “বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ শুধু বিচার দাবি করবে না; নারী হত্যা ও সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, দ্রত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং সামাজিকভাবে সহনশীল পরিবেশ তৈরির জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে। নারীর মানবাধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।”

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন জানুয়ারি থেকে জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ১৬৬৭ জন নারী ও শিশু বিভিন্ন ধরণের সহিংসতার শিকার হয়েছেন, ২৯২ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনায় স্পষ্ট হয় বাংলাদেশের নারী ও শিশুরা আজ কোনো জায়গাতেই পুরোপুরি নিরাপদ নয়। শুধু ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতাই নয়, হত্যা, নির্যাতন ও নানা ধরনের সহিংসতার শিকার হচ্ছে নারী ও শিশুরা। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই সহিংসতার প্রবণতা আমরা কমাতে পারছি না। যে শিশুটি এখনও শারীরিক ও মানসিকভাবে পূর্ণ বিকাশ লাভ করেনি, যে শিশু এখনও নিজেকে একজন নারী হিসেবে চিহ্নিত করার বয়সে পৌঁছায়নি, সেই শিশুও যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো অপরাধীরা বিভিন্ন বয়সের মানুষ। শিশু, কিশোরী, তরুণী কিংবা বৃদ্ধা কেউই এই সহিংসতার বাইরে নয়। যদি কেউ মনে করেন, ১৬ কোটি, ১৮ কোটি বা ২০ কোটি মানুষের দেশে কয়েকশ নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতার ঘটনা সংখ্যার বিচারে খুব বেশি নয়, তাহলে আমরা সেই ধারণাকে ধিক্কার জানাই। একটি নারী বা একটি শিশুর জীবনও কোনোভাবেই নগণ্য নয়। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই যেখানে নারী ও শিশুরা স্বাধীনভাবে, নিরাপদে এবং মর্যাদার সঙ্গে চলাফেরা করতে পারবে। যেখানে পরিবার হবে নিরাপদ, সমাজ হবে সহনশীল এবং রাষ্ট্র হবে তাদের অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দাতা। নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের পাশাপাশি পরিবার, সমাজ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং প্রতিটি নাগরিককে সম্মিলিতভাবে দায়িত্ব নিতে নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরো বলেন নারী ও শিশুর চারপাশে একটি শক্তিশালী নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে হবে, যাতে তারা স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে তাদের অধিকার ভোগ করতে পারে। একই সঙ্গে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানান। পাশাপাশি বলেন, শুধু অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর বিচার করলেই হবে না। কীভাবে এই অপরাধ প্রতিরোধ করা যায়, কীভাবে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সহিংসতার সংস্কৃতি বন্ধ করা যায় সেদিকেও সমান গুরুত্ব দেয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
উপস্থিত অন্যান্য বক্তারা বলেন, নারীর প্রতি ক্রমবর্ধমান সহিংসতা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। বাংলাদেশ আজ ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যে কোন সহিংসতার ঘটনায় নারীকে প্রধান টার্গেট করা হয়। প্রচলিত পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক বৈষম্যমূলক রীতিনীতি নারীকে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেনা। নারীর প্রতি অব্যাহত সহিংসতা, ধর্ষণ, হত্যা ও শিশু হত্যা প্রতিরোধে ও ভুলুণ্ঠিত মানবাধিকার পুনরুদ্ধারে বক্তারা এসময় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি আইনের সঠিক প্রয়োগ, আইন বাস্তবায়নে মনিটরিং করা সহ রাষ্ট্রপ্রধান কে দেশপ্রেম, মানবতাবোধ ও দায়িত্ববোধ থেকে রাষ্ট্রপরিচালনার আহ্বান জানান।







