শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬, ০২:৫২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার দাবিতে বাংলাদেশ কংগ্রেসের মানববন্ধন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক-এর শোক সভা অনুষ্ঠিত শিশুদের মানবিক গুণাবলি জাগ্রত করতে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা : লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল আর্জেন্টিনার বিপক্ষে হার আমাকে দীর্ঘ সময় তাড়িয়ে বেড়াবে : বার্ন ইরানে একদিনে দুই দফা হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র মেরে ট্যাংকার অচল দেশের রপ্তানির ১৭.৫১ শতাংশ এসেছে বেপজা থেকে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কেবল টিকে থাকাই যথেষ্ট ছিল না’ হেরে যাওয়ার পরও কৌশলগত সিদ্ধান্তে অটল টুখেল বিশ্বে নতুন নজির: গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা করল মাস্কের ‘এক্সএআই’ বিশ্বে ফের অস্থির তেলের দাম, বিপিসির বড় লোকসানের শঙ্কা

বিশ্বে ফের অস্থির তেলের দাম, বিপিসির বড় লোকসানের শঙ্কা

নিজস্ব প্রতিনিধি / ৪ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

বিশ্বে ফের অস্থির তেলের দাম, বিপিসির বড় লোকসানের শঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা-পাল্টাহামলায় আবারও অস্থির হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ফের ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও আমদানি ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

সবচেয়ে বড় চাপের মুখে পড়তে যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যে তেল কিনে দেশে কম দামে বিক্রি করতে হওয়ায় সংস্থাটি আবারও বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও এলএনজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর ফলে বেশি দামে আমদানি করেও অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম সমন্বয় না করায় সরকারকে প্রায় ৩১ হাজার কোটি টাকার আর্থিক চাপ বহন করতে হয়েছে।

এর মধ্যে শুধু মার্চ থেকে জুন—এই চার মাসে তেল আমদানিতে বিপিসির লোকসান হয়েছে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা। বাকি অংশ এসেছে এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় থেকে। হরমুজ প্রণালি ঘিরে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই লোকসান আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা। কারণ বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের বড় একটি অংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এ পথের যেকোনো অস্থিরতা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত চার মাসে তেল আমদানিজনিত লোকসানের বিপরীতে সরকার এখন পর্যন্ত কোনো ভর্তুকি দেয়নি। ফলে ইস্টার্ন রিফাইনারি-২সহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থ ব্যবহার করে তেল আমদানির বিল পরিশোধ করতে হয়েছে। বারবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে ভর্তুকির জন্য চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কোনো অর্থ ছাড় হয়নি।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী গতকাল বুধবার বলেন, ‘বিদ্যমান আমদানি চুক্তিগুলো স্বাভাবিকভাবে কার্যকর থাকলে জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত থাকবে। তবে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে চলমান যুদ্ধ আরো তীব্র আকার ধারণ করলে সরবরাহব্যবস্থায় কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে।’

বিপিসির আর্থিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতিষ্ঠানটির ওপর চাপ বেড়েছে। সরকার থেকে বিপিসিকে কোনো ভর্তুকি দেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে।’

বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং ইকোনমিকস জানায়, গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ১.১২ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল হয় ৮০.২৩ ডলার। এর পাশাপাশি লন্ডনের ব্রেন্ট অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ০.৭০ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল হয় ৮৫.৩১ ডলার। এক সপ্তাহে উভয় তেলের দাম ৯ শতাংশ বেড়েছে।

ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা ও সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক তেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে, যার ফলে চলতি সপ্তাহে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর রপ্তানি বাড়ালেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বাজারে নতুন করে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হলো এলএনজি আমদানি। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গত মার্চ থেকে কোনো সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এলএনজি দিচ্ছে না। ফলে পেট্রোবাংলাকে পুরোপুরি স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। মার্চ মাসে বাংলাদেশকে প্রতি ইউনিট এলএনজি ২৮ ডলার দিয়ে কিনতে হলেও যুদ্ধবিরতির পর তা কমে ১৬-১৭ ডলারে নেমে এসেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দাম আবার বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা বাড়লে তেল ও এলএনজির দাম বাড়বে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। যুদ্ধবিরতির পর এলএনজির দাম কমলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজার কোন দিকে যায় সেটিই এখন দেখার বিষয়।’

বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যেও আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে ১৬ লাখ টন ডিজেল, অকটেন, ফার্নেস অয়েল ও জেট ফুয়েল আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে সরবরাহকারী কম্পানিগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক সমঝোতা সম্পন্ন হয়েছে এবং বিপিসির পরিচালনা পর্ষদও প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। এখন এটি সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

জানা গেছে, গত ২০ জুন সিঙ্গাপুরে ১০টি আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে জ্বালানি তেল পরিবহনের প্রিমিয়াম কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন (আইওসিএল) প্রথমে প্রতি ব্যারেলে ৯.৫ ডলার প্রিমিয়ামে তেল সরবরাহে সম্মত হলে ইউনিপেক, পেট্রোচায়নাসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান একই দরে রাজি হয়। বর্তমানে উন্মুক্ত দরপত্রে যে প্রিমিয়াম সাড়ে ১৩ ডলারের বেশি দিতে হচ্ছে, তার তুলনায় এই চুক্তিতে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, মাত্র এক সেন্ট প্রিমিয়াম কমলে দেশের প্রায় ৮২ লাখ টাকা সাশ্রয় হয়। সে হিসাবে ১৬ লাখ টন তেল আমদানিতে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে এই সুবিধার বড় অংশই কমে যেতে পারে।

সরকারি হিসাবে, এই ১৬ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যয় হবে ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তবে চূড়ান্ত ব্যয় নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক বাজারদরের ওপর।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গত মার্চে যুদ্ধের সময় সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তা বিবেচনায় রেখে এবার আগেভাগেই সব ডিপোকে সতর্ক করা হয়েছে। তাই তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানিসংকটের আশঙ্কা না থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে বিপিসির লোকসান এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ আরো বাড়বে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশ্ববাজারে তেলের এই অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে সরকারের সামনে দুটি পথই খোলা থাকবে, হয় বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দিয়ে মূল্য স্থিতিশীল রাখা, নয়তো অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা। দুই ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়বে সরকারি অর্থব্যবস্থা, মূল্যস্ফীতি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

Archives