কম-কার্বন ভবনে গুরুত্ব পাবে নির্মাণসামগ্রীর কার্বন নিঃসরণ: আইইবির সেমিনারে বক্তারা
আইইবির সেমিনারে বক্তারা বললেন, ভবনের বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ‘এমবডিড কার্বন’ কমানোর ওপর জোর দিতে হবে ভবন নির্মাণে শুধু শক্তি সাশ্রয়ী নকশা করলেই হবে না, নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, পরিবহন ও ব্যবহারের পুরো জীবনচক্রে কতটা কার্বন নিঃসরণ হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে। ভবিষ্যতের টেকসই ও জলবায়ুবান্ধব নির্মাণব্যবস্থায় কম-কার্বন ও জৈবভিত্তিক (বায়ো-বেসড) নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রকৌশল ও স্থাপত্য বিশেষজ্ঞরা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশের (আইইবি) সদর দপ্তরের শহীদ প্রকৌশলী ভবনের কাউন্সিল হলে আয়োজিত ‘ইঞ্জিনিয়ারিং লো-কার্বন অ্যান্ড বায়ো-বেসড বিল্ডিংস: ফ্রম ম্যাটেরিয়াল ক্যারেক্টারাইজেশন অ্যান্ড এলসিএ টু ইপিডি অ্যান্ড বিল্ডিং পারফরম্যান্স’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। আইইবির উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আইইবির ভাইস-প্রেসিডেন্ট (একাডেমিক ও আন্তর্জাতিক) প্রকৌশলী খান মনজুর মোরশেদ। সভাপতির বক্তব্যে খান মনজুর মোরশেদ বলেন, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে। তবে কোনো প্রযুক্তি বা আবিষ্কারের সুফল নির্ভর করে সেটি কী উদ্দেশ্যে এবং কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। ডিনামাইটের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যে প্রযুক্তি একসময় খনি, সড়ক, রেলপথ ও অবকাঠামো নির্মাণে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল, পরবর্তী সময়ে সেটিই যুদ্ধ ও ধ্বংসযজ্ঞে ব্যবহৃত হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির অগ্রগতির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করলেও এর অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সামাজিক যোগাযোগ, পারিবারিক বন্ধন ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন আইইবির সম্মানী সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা ওয়াসার চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী মো. সাব্বির মোস্তফা খান।তিনি বলেন, পুরকৌশলের ভবিষ্যৎ চর্চায় নির্মাণসামগ্রী ও ম্যাটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একটি অবকাঠামো কতটা নিরাপদ, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সঠিক নির্মাণসামগ্রী নির্বাচন এবং সেই উপকরণের প্রকৌশলগত বৈশিষ্ট্য বোঝার ওপর। তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে নির্মাণব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। পাথর, কাঠ ও স্থানীয় উপকরণনির্ভর নির্মাণ থেকে এখন বহুতল ও হাইরাইজ ভবন নির্মাণ হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে নতুন নির্মাণসামগ্রীর উদ্ভাবন, স্ট্রাকচারাল অ্যানালাইসিস, ভূমিকম্প প্রকৌশল ও আধুনিক নির্মাণপ্রযুক্তির সমন্বয়। উপকূলীয় এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণের আগে স্থানীয় আবহাওয়া ও জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। সেমিনারে সম্মানিত অতিথির বক্তব্য দেন বিএইচটিইর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. প্রকৌশলী তানভীর মঞ্জুর। তিনি বলেন, বাংলাদেশে স্থায়ী ভবন নির্মাণে মূলত কংক্রিট, রড, ইট ও সিমেন্টনির্ভর নির্মাণব্যবস্থা প্রচলিত। অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে টিন, বাঁশ, কাঠসহ স্থানীয় উপকরণ দিয়ে তুলনামূলক হালকা ঘর নির্মাণের প্রচলন রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রেক্ষাপটে প্রচলিত নির্মাণব্যবস্থাকে নতুন করে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। তানভীর মঞ্জুর বলেন, সিমেন্ট উৎপাদনের সময় ক্লিংকার তৈরিতে চুনাপাথরের ক্যালসিনেশন এবং উচ্চ তাপমাত্রার কিলন প্রক্রিয়া থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) নির্গত হয়। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৭ থেকে ৮ শতাংশের সঙ্গে সিমেন্ট শিল্পের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।তাই ভবিষ্যতের কম-কার্বন ভবন নির্মাণে শুধু ভবন ব্যবহারের সময় বিদ্যুৎ খরচ কমানোর বিষয়টি দেখলে হবে না। নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন ও সরবরাহের পুরো প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট এমবডিড কার্বন বা উপকরণের মধ্যে নিহিত কার্বন নিঃসরণও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোছা. ফেরদৌস বেগম। নকশার শুরুতেই কার্বন হিসাব সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন যুক্তরাজ্যের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েলশ স্কুল অব আর্কিটেকচারের সহযোগী অধ্যাপক ড. এশরার লতিফ। তিনি বলেন, ভবন নির্মাণ ও পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ শক্তি ও কাঁচামাল ব্যবহৃত হয়। তাই ভবনের কার্বন ফুটপ্রিন্ট নির্ধারণে শুধু ব্যবহারের সময়ের বিদ্যুৎ খরচ বিবেচনা করলে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। সিমেন্ট, স্টিল, ইট, কাচসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন ও পরিবহনের সময় যে কার্বন নিঃসরণ হয়, সেটিও ভবনের মোট পরিবেশগত প্রভাবের অংশ বলে তিনি উল্লেখ করেন। ড. এশরার লতিফ বলেন, ভবনের কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমাতে হলে নকশার শুরু থেকেই নির্মাণসামগ্রী নির্বাচন, নির্মাণপদ্ধতি এবং ভবনের শক্তি ব্যবস্থাপনা বিবেচনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে লাইফ সাইকেল অ্যাসেসমেন্ট (LCA), এনভায়রনমেন্টাল প্রোডাক্ট ডিক্লারেশন (EPD) এবং ভবনের প্রকৃত পারফরম্যান্স মূল্যায়নের মতো পদ্ধতি ভবিষ্যতের নির্মাণখাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রকৌশলীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর তাগিদ সেমিনারে সঞ্চালনা করেন আইইবির পুরকৌশল বিভাগের সম্পাদক প্রকৌশলী নেসার উদ্দিন। অনুষ্ঠানে আইইবির সম্মানী সহকারী সাধারণ সম্পাদক (প্রশাসন ও অর্থ) প্রকৌশলী মুহাম্মদ আহসানুল রাসেল, কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য, প্রকৌশল বিভাগের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন সংস্থা ও অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের বাস্তবতায় নির্মাণখাতের কার্বন নিঃসরণ কমাতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। ভবনের নকশা থেকে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, নির্মাণকাজ, ব্যবহার এবং ভবনের জীবনচক্র শেষে উপকরণ পুনর্ব্যবহার—প্রতিটি পর্যায়কে পরিবেশগত হিসাবের আওতায় আনতে হবে। তাঁদের মতে, কম-কার্বন ও বায়ো-বেসড নির্মাণসামগ্রীর গবেষণা, মান নির্ধারণ এবং ব্যবহার বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের নির্মাণখাত একদিকে যেমন জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় ভূমিকা রাখতে পারবে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের পথও তৈরি হবে।







