দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংস্কার ভাবনা
দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির ঊর্ধ্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংস্কার ভাবনা
একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিবর্তন ও কাঠামোগত রূপান্তর তখনই টেকসই রূপ লাভ করে, যখন তা সংকীর্ণ দলীয় বৃত্ত অতিক্রম করে বৃহত্তর জাতীয় ঐকমত্যের সমান্তরালে পরিচালিত হয়। চব্বিশের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান উত্তর বাংলাদেশে এই রাজনৈতিক দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা আজ যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে। দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলমান প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, সুশাসনের সংকট এবং মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের পটভূমিতে রাষ্ট্র সংস্কারের যে দাবি গণমানুষের মনস্তত্ত্বে প্রোথিত হয়েছিল, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভূমিধ্বস ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হয়ে গঠিত বর্তমান সরকারের রাষ্ট্রদর্শনে তার একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপরেখা আমরা লক্ষ্য করছি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি’র রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের সুনির্দিষ্ট ৩১ দফা কর্মসূচি মূল্যায়ন করলে এটি স্পষ্ট হয় যে, তাঁর এই সংস্কার ভাবনা কেবল ক্ষমতার পালাবদলের সনাতনী রাজনৈতিক কৌশল নয়, বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ, বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণের তাত্ত্বিক দলিল।
অপরাধবিজ্ঞান, সুশাসন ও মানবাধিকারের একজন গবেষক হিসেবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভারসাম্যহীনতা ও ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণের কুফল আমরা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। একটি কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনে ‘উইনার-টেকস-অল’ বা ‘বিজয়ী সব পাবে’—এই ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান হওয়া জরুরি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফায় ঠিক এই জায়গাতেই আঘাত করেছেন। নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার সুনির্দিষ্ট পৃথকীকরণ ও ভারসাম্য রক্ষা এবং একজন প্রধানমন্ত্রী পরপর দুই মেয়াদের বেশি দায়িত্বে না থাকার যে প্রস্তাব তিনি করেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত। এই প্রস্তাবগুলোর অন্তর্নিহিত দর্শন হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিক একনায়কতন্ত্রের পথ চিরতরে রুদ্ধ করা এবং ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি’র সংস্কার ভাবনার আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এর তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ধারাবাহিকতা। যখন সমকালীন রাজনীতিতে সংস্কারের আলাপ কেবল আপৎকালীন স্লোগান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল, তখন তিনি আজ থেকে কয়েক বছর আগেই এই ৩১ দফায় রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলেন। এটি প্রমাণ করে যে তাঁর সংস্কারের দর্শন আকস্মিক কোনো রাজনৈতিক চমক বা তাৎক্ষণিক নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার কৌশল নয়, বরং এটি দেশের আপামর জনসাধারণের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে দীর্ঘ রাজনৈতিক পর্যালোচনার ফসল। এই রূপরেখা মূলত শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, বেগম খালেদা জিয়ার ‘ভিশন-২০৩০’ এবং তাঁর নিজস্ব ২৭ দফাকে ধারণ করে গঠিত এক আধুনিক ও সময়োপযোগী তাত্ত্বিক কাঠামো।
সুশাসনের মাপকাঠিতে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নাগরিকের মৌলিক ও মানবাধিকারের সুরক্ষা অন্যতম প্রধান সূচক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বক্তব্যে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে যে, মানুষের বাক-স্বাধীনতা, ভোটাধিকার এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ব্যতিরেকে কোনো সংস্কারই টেকসই হতে পারে না। বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণে সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা, সংবিধানের বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক ৭০ অনুচ্ছেদের যৌক্তিক সংশোধন এবং স্বাধীন ‘ওমবাডসম্যান’ বা ন্যায়পাল নিয়োগের মতো প্রস্তাবগুলো সুশাসনের তাত্ত্বিক কাঠামোকে মজবুত করে। অপরাধবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে এবং সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধি অভিযানের যে বিকল্প নেই- তাঁর সংস্কার ভাবনায় সেই প্রতিফলন অত্যন্ত স্পষ্ট।
সমালোচকদের অনেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কারের সদিচ্ছা নিয়ে অতীতে প্রশ্ন তুলেছেন। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে স্বীকার করেছেন যে, দল বা ব্যক্তির সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে, তবে ভুল সংশোধনের এবং জবাবদিহিতার সংস্কৃতি তৈরি করাই আধুনিক রাজনীতির মূল ভিত্তি। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছেন যে, অপরাধী বা অন্যায়ের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের তাঁর দলে বা সরকারে কোনো স্থান নেই। এই নৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও সুশাসনের গুণগত পরিবর্তনের একটি বড় নিয়ামক।
তিনি সংস্কারের ধারণাকে শুধু সাংবিধানিক ও আইনি মারপ্যাঁচের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সাধারণ মানুষের প্রাধিক জীবনের অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো মৌলিক অধিকারের সাথে সংযুক্ত করেছেন। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের টেকসই অর্থনীতি গড়ার যে কৌশলগত ইশতেহার তিনি দিয়েছেন, তা দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের এক বাস্তবমুখী অর্থনৈতিক রূপরেখা।
আজকের বাস্তবতা হলো, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেবল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতা নন; তিনি সমগ্র বাংলাদেশের সবার প্রধানমন্ত্রী। একজন প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি সবসময় দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় কল্যাণমুখী হতে হয়। তাঁর ঘোষিত রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফাকে ধারণ করে বর্তমান সরকারের যে অগ্রযাত্রা, তা-ই প্রমাণ করে তাঁর চিন্তাভাবনা কতটা বাস্তবসম্মত এবং জাতীয় ঐকমত্যের দাবিদার।
সংস্কার কোনো স্থবির বিষয় নয়, এটি একটি নিরবচ্ছিন্ন ও চলমান প্রক্রিয়া। একটি উন্নত ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য আমাদের রাজনৈতিক দলকানা মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির উর্ধ্বে উঠে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি’র এই যুগোপযোগী ও কাঠামোগত রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ ও পরিকল্পনাগুলোকে জাতীয় স্বার্থে সফল করতে সর্বাত্মক সহযোগিতা দেওয়া আজ সময়ের দাবি। কারণ, এই সংস্কার ভাবনার সফল বাস্তবায়নই পারে একটি বৈষম্যহীন, সাম্যবাদী ও সুশাসিত বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে।







