শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে পূজা উদযাপন পরিষদের নানা কর্মসূচি: বিচারহীনতা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ
শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে পূজা উদযাপন পরিষদের নানা কর্মসূচি: বিচারহীনতা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির: শুভ জন্মাষ্টমী উদযাপন উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী নানারকম ধর্মীয় ও শুভ শোভাযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ‘বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ’ ও ‘মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি’। বুধবার (৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫) ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এ কর্মসূচির কথা জানান।
একই সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেশের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, নির্যাতন, জমি দখল ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ এবং ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।
২ দিনের বর্ণাঢ্য জন্মাষ্টমী কর্মসূচি
বিজ্ঞপ্তি সূত্রে জানা যায়, ভগবান শ্রীকৃষ্ণের শুভ আবির্ভাব তিথি জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে:
- প্রথম দিন (৪ সেপ্টেম্বর):
- সকাল ৮:০০ টা: দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় শ্রীশ্রীগীতাযজ্ঞ।
- বিকেল ৩:০০ টা: ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী মিছিলে চট্টগ্রাম সীতাকুণ্ডের শংকর মঠ ও মিশন থেকে গীতায়জ্ঞ পরিচালনা করা হবে। এরপর পুরান ঢাকার পলাশীর মোড়ে ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রীয় জন্মাষ্টমী মিছিলের শুভ উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হবে। এ মিছিল বাহাদূর শাহ্ পার্কে গিয়ে শেষ হবে।
- রাতে: ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাঙ্গনে শ্রীকৃষ্ণপূজা।
- দ্বিতীয় দিন (১১ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার):
- বিকেল: ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গনে আলোচনা সভা। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন ধর্মের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন।
নেতৃবৃন্দ জানান, জন্মাষ্টমী মিছিলে নিরাপত্তার স্বার্থে নির্দেশাবলি অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। সকালে আয়োজিত শোভাযাত্রা দুপুর ১২টার মধ্যে এবং বিকালের শোভাযাত্রা সন্ধ্যার আগেই সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের পাশাপাশি প্রতিটি পূজা কমিটি নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দল মোতায়েন রাখবে।
ঐতিহাসিক জন্মাষ্টমী মিছিলের ইতিহাস
সংগঠনের পক্ষ থেকে বলা হয়, ৩০ ও ৪০-এর দশকে পুরান ঢাকার এই জন্মাষ্টমী মিছিল সমগ্র উপমহাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন নবাব পরিবারের প্রত্যক্ষ আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তায় এ মিছিল পরিচালিত হতো। তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির কারণে এ ঐতিহ্যবাহী মিছিল বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটি চার দশক পর এই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে পুনরায় ফিরিয়ে আনে।
সাম্প্রতিক সহিংসতা ও ৮ দফা দাবি
মতবিনিময় সভায় দেশের সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। অতি সম্প্রতি রংপুরে গণপতি চক্রবর্তীর পুরো পরিবারকে উচ্ছেদ ও বর্বর হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।
ঐক্য পরিষদের এক প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে জানানো হয়, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে সারাদেশে ২৫৭টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে ৪৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং ২৬১ জন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। এছাড়া জুলাই মাসে ৪৫টি এবং আগস্ট মাসে ৪১টি সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটে।
সংখ্যালঘুদের সার্বিক অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হিন্দু সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে ৮ দফা দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়:
১. সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন।
২. জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন ও সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন।
৩. অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী জমি হস্তান্তর।
৪. জনসংখ্যার আনুপাতিক হারে সরকার, সংসদ ও জনপ্রতিনিধিত্বশীল সকল সংস্থায় অংশীদারিত্ব ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
৫. দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণে আইন প্রণয়ন।
৬. বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়ন।
৭. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম স্থানীয় পরিষদ আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং সমতলের আদিবাসীদের জন্য ভূমি কমিশন গঠন।
৮. হিন্দু সম্প্রদায়ের শারদীয় দুর্গাপূজায় অষ্টমী থেকে দশমী পর্যন্ত ৩ দিন, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা পূর্ণিমায় ১ দিন এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ইস্টারে ১ দিন সরকারি ছুটি ঘোষণা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নেতৃবৃন্দ দেশের শান্তি, সম্প্রীতি ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।







