১৮০ দিনের শাসন পর্যালোচনাঃ সংস্কারপ্রয়াস ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
১৮০ দিনের শাসন পর্যালোচনাঃ সংস্কারপ্রয়াস ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-উত্তর রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘ অন্তর্বর্তীকালীন শাসনের জটিল অচলাবস্থা পেরিয়ে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণ ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের এক যুগান্তকারী অধ্যায়। দায়িত্ব গ্রহণের ১৮০ দিন বা প্রথম ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার এ ক্ষণে সরকারের নীতি-কৌশল, ৬টি প্রধান সংস্কারমূলক সাফল্য এবং ৬টি বিরাজমান কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ বিশদ প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ৬টি সাফল্যঃ
১. গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা: আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিদ্যার ‘হেজিমোনিক স্ট্যাবিলিটি থিওরি’ অনুযায়ী, দীর্ঘ শাসনহীনতার পর সামাজিক সংঘাত এড়ানোই রাষ্ট্রের প্রথম পরীক্ষা। অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভঙ্গুর পরিবেশ কাটিয়ে দেশে একটি স্বস্তিদায়ক ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সরকারের বড় কৌশলগত অর্জন।
২. রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন ও ভিআইপি সংস্কৃতির অবসান: প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ট্যাক্স-ফ্রি গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়ার সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় কৃচ্ছ্রসাধনের প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টান্ত। প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ ট্রাফিকে অবস্থান করার নজির নাগরিক মনস্তত্ত্বে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
৩. সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিস্তার (ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড): জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্রভাবনার অংশ হিসেবে নির্বাচনী ইশতেহার ও ৩১ দফার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হয়েছে, যা তৃণমূল অর্থনীতির সুরক্ষা নিশ্চিত করছে।
৪. ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ: বিগত সময়ে বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা আনা এবং মার্জ বা বন্ধ হওয়া ৫টি ব্যাংককে পুনরুজ্জীবিত করতে বিশেষ তহবিল গঠন সামষ্টিক অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর বাস্তবমুখী পদক্ষেপ।
৫. জুলাই বিপ্লবের শহীদদের পুনর্বাসন ও জনকল্যাণ: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের তালিকা প্রণয়ন, আহতদের দ্রুত চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং কৃষিঋণ মওকুফের মতো মানবিক সিদ্ধান্তগুলো রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার পরিচায়ক।
৬. কূটনৈতিক ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: প্রধান উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টার জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকারের বড় কূটনৈতিক সাফল্য।
সরকারের গুরুতর ৬টি চ্যালেঞ্জঃ
১. উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণে স্থবিরতা: রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল সংকট নিত্যপণ্যের বাজার। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতার কারণে গত ৬ মাসে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে কোনো দৃশ্যমান স্বস্তি আসেনি।
২. তীব্র বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট: গ্যাস ও বিদ্যুতের দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় শিল্পোৎপাদন মারাত্মক ব্যাহত হচ্ছে, যা প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করার ঝুঁকিতে ফেলছে।
৩. তদ্বির, চাঁদাবাজি ও তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণহীনতা: রাজনৈতিক রূপান্তরের ‘অ্যানোমি’ বা অস্থিতিশীলতার সুযোগে তৃণমূল পর্যায়ে দলের কিছু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে নতুন করে চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অভিযোগ উঠেছে, যা হাইকমান্ড পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি।
৪. আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তার অভাব: গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারের প্রত্যাশা থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন ‘মব-ভায়োলেন্স’ ও অস্থিতিশীলতা পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব হয়নি।
৫. প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান থেকে ফ্যাসিস্টের দোসরদের নির্মূল করতে না পারা: প্রশাসনের শীর্ষস্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন, জেলা পরিষদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালে বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সুবিধাভোগী আমলা ও দোসররা এখনো বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের শুধু বদলি করা হয়েছে কিন্তু জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি। ফলে তারা ভেতর থেকে সরকারের সংস্কার কাজকে বাধাগ্রস্ত (Sabotage) করছে এবং নতুন বাংলাদেশের মূল নাগরিক প্রত্যাশা পূরণে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৬. কর্মসংস্থান ও বেকার ভাতার স্থবিরতা: তরুণ সমাজের অন্যতম প্রধান প্রত্যাশা—দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেকার ভাতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া ছাত্র ও যুব সমাজের মাঝে অসন্তোষের জন্ম দিচ্ছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামোর ভিত্তিতে বলা যায়, রাজনৈতিক সরকারের প্রথম ১৮০ দিন ছিল মূলত ‘নীতি নির্ধারণ ও পরিকল্পনার অধ্যায়’। দীর্ঘমেয়াদী সংস্কারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও রাষ্ট্রীয় কৃচ্ছ্রসাধনের দৃষ্টান্ত প্রশংসনীয় হলেও প্রাত্যহিক জীবনের মৌলিক সংকট—দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ ও নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলোতে দ্রুত বাস্তবসম্মত ফল প্রদান করাই এখন তারেক রহমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নীতি নির্ধারণী পর্যায় থেকে এ সংকটগুলো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে সমাধান করা গেলে নতুন বাংলাদেশের এই গণতান্ত্রিক রূপান্তর আরও গতিশীল ও টেকসই রূপ লাভ করবে।







