সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতির বিচার ও আইনি সুরক্ষা: সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ কি অপরাধের চিরস্থায়ী লাইসেন্স? বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এর ৬টি বিতরণ অঞ্চল বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের ঘোষণার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ মাদকাসক্তির নির্মম বলি: পারিবারিক সুরক্ষার ভাঙন ও আমাদের সামাজিক দায় ভূ-রাজনীতির সমীকরণ ও জাতীয় স্বার্থঃ সবার আগে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও নান্দনিকতা: ভিসি-দের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও পোশাকের সামাজিক প্রভাব উল্টো রথযাত্রা উদযাপন-ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে স্বামীবাগ ইসকন মন্দির দিল্লীতে ছাত্র-আন্দোলন বাংলাদেশের মত ভুলপথে যাবেনা তো? রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও রাজনীতির সমীকরণ: প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা ইতিহাসে প্রথমবার, নিজেদের মাঠেই ‘অতিথি’ ভারত নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভের মুখে শিক্ষা সচিব বদলি, অনশন ভাঙলেন সোনাম ওয়াংচুক

মাদকাসক্তির নির্মম বলি: পারিবারিক সুরক্ষার ভাঙন ও আমাদের সামাজিক দায়

​রাঙ্গামাটি : ছন্দ সেন চাকমা / ৫৬ Time View
Update : রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

মাদক নামক এক মরণনেশা আজ আমাদের সমাজব্যবস্থার শিকড়ে আঘাত হানছে। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক গণ্ডি পেরিয়ে এটি এখন এমন এক সামাজিক ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে, যা রক্তের সম্পর্ককেও রক্তাক্ত করতে দ্বিধা করছে না। সম্প্রতি রাঙামাটির আসামবস্তি এলাকায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের পারিবারিক সুরক্ষা, সামাজিক অবক্ষয় এবং মাদকাসক্তির ভয়াবহ পরিণতির এক করুণ দলিল। নেশার টাকার জন্য মায়ের হাতে ২১ বছরের তরতাজা যুবকের প্রাণ ঝরে যাওয়ার এই ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দেয় এবং গভীর আত্মোপলব্ধির সময় এনে দেয়।

​ঘটনার অন্তরালে: পারিবারিক ট্র্যাজেডির নেপথ্য চিত্র
​গত শনিবার(২৫-০৭-২০২৬) দুপুরে রাঙামাটি শহরের আসামবস্তি এলাকায় যা ঘটেছিল, তা যেকোনো সভ্য সমাজের জন্যই লজ্জাজনক। নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন সাকিফুল ইসলাম। নেশার টাকার জোগান না পেয়ে নিজের বাবা-মাকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা তার নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে চুরি ও মাদক মামলা ছিল, এমনকি জেল খেটেও এসেছিলেন তিনি।
​ঘটনার দিন নেশার ঘোরে তিনি যখন নিজ মা রেখা বেগমের কাছে টাকার আবদার করেন এবং অস্বীকার করায় হাতের কাছে থাকা ধারালো অস্ত্র (দা) দিয়ে বাবা-মাকে আক্রমণ করতে উদ্যত হন, তখনই আত্মরক্ষার লড়াইয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মা যখন নিজের ও স্বামীর জীবন বাঁচাতে ছেলের হাত থেকে অস্ত্র ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন, ঠিক তখনই অসাবধানতাবশত সেই ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মারাত্মক জখম হন সাকিফুল। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় পিতা মো. রফিকুল ইসলাম ও মাতা রেখা বেগমকে পুলিশ আটক করেছে। দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ এবং একটি পরিবারের ভেতরে মাদকাসক্তির তীব্র বিষবাষ্প কীভাবে এই চরম পরিণতির জন্ম দিল, তা আজ আমাদের গভীরভাবে ভাবাচ্ছে।

​মাদকাসক্তি: পারিবারিক কাঠামোর অদৃশ্য ধ্বংসলীলা
​মাদক আজ কেবল যুবসমাজকে ধ্বংস করছে না, বরং এটি পরিবার নামের নিরাপদ আশ্রয়স্থলগুলোকেও ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। রাঙামাটির এই ঘটনায় একদিকে যেমন একজন তরুণ তার জীবন হারিয়েছেন, অন্যদিকে একজন মা আজ সন্তানের ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন—যিনি একসময় একই সন্তানকে বুকে আগলে বড় করেছিলেন।

​মাদকের নেশা মানুষের মস্তিষ্কের বিচারবুদ্ধি এমনভাবে লুপ্ত করে দেয় যে, সে ভুলে যায় আপন-পরের ব্যবধান। যে সন্তানের মায়ায় বাবা-মা নিজেদের সুখ বিসর্জন দেন, সেই সন্তানই যখন মাদকের অন্ধত্বে বুঁদ হয়ে বাবা-মার ওপর চড়াও হয়, তখন সমাজ ও পরিবারের মৌলিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, মাদকাসক্তি শুধু একজন ব্যক্তির পতন ঘটায় না, বরং পুরো পরিবারকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।

সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত প্রতিরোধ, ​রাঙামাটির এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি থেকে আমাদের কিছু অত্যন্ত কঠোর ও সময়োপযোগী শিক্ষা নিতে হবে, ​পারিবারিক সচেতনতা ও কাউন্সেলিং: সন্তান মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার শুরুতেই তাকে অপরাধী হিসেবে না দেখে একজন রোগী হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত রিহ্যাবে বা চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো উচিত।

অনেক পরিবার সামাজিক লজ্জার ভয়ে বিষয়টি লুকিয়ে রাখে, যা পরবর্তীতে এমন ভয়াবহ রূপ নেয়।​মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন: পাড়া-মহল্লায় মাদকের সরবরাহ ও সিন্ডিকেটগুলো ধ্বংস করতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার পাশাপাশি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও যুবসমাজকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

​পুনর্বাসন কেন্দ্র ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: প্রতিটি জেলায় পর্যাপ্ত সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দরিদ্র বা সাধারণ পরিবারগুলো নামমাত্র খরচে তাদের সন্তানকে সঠিক চিকিৎসা করাতে পারে।

মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে লড়াই কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। রাঙামাটির আসামবস্তির এই ঘটনা যেন একটি বার্তা হয়ে থাকে—মাদকের কালো থাবা থেকে আমাদের পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে না পারলে এ ধরনের মর্মান্তিক পরিণতির পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব নয়। সময় এখনই, সম্মিলিতভাবে এই সামাজিক ব্যাধিকে প্রতিহত করার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

Archives