শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:২৬ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
সৌদি সরকারের নেতৃত্বে ‘মাল্টিন্যাশনাল মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ জোট-এ বাংলাদেশ যুক্ত হওয়ার প্রতিবাদে  জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট শেখ হাসিনার দেশে ফিরার ঘোষণা ‘রাজনৈতিক স্ট্যান্ডবাজি’ নিরাপদ সড়ক সবার অধিকার বাংলাদেশে হিন্দু কথা বললেই তাঁর কপালে দু:খ নেমে আসে? বক্তব্য দেওয়ার আগেই বক্তব্য ‘হিট’ জাতিসংঘের হিসাব ও সরকারি গেজেটের বাইরে থাকা ৫৬৪ নিহতের পরিচয় প্রকাশের দাবি বিসিআরএসের চোরাই মোবাইল কেনাবেচার রমরমা বাণিজ্য: সক্রিয় সিন্ডিকেট, ঝুঁকিতে সাধারণ মানুষ বিআইডব্লিউটিএ কার্যালয়ের সামনে ১১ দফা দাবিতে বাংলাদেশ বাল্কহেড মালিক-শ্রমিকদের মানববন্ধন বিয়ের প্রলোভনে যৌন সম্পর্ক: প্রতারণা নাকি ধর্ষণ? রাজনৈতিক পুনর্জাগরণের বার্তা দিয়ে আত্মপ্রকাশের ঘোষণা: ‘বাংলাদেশ জনরাষ্ট্র আন্দোলন’

নিরাপদ সড়ক সবার অধিকার

লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল / ৩৩ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬

সড়ক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ। শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক যোগাযোগ সবকিছুই সড়ক ব্যবস্থার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু এই সড়ক যদি নিরাপদ না হয়, তবে তা মানুষের জীবন ও সম্পদের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হয়। প্রতিদিন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় এবং অসংখ্য মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করে। বাংলাদেশেও এই সমস্যা খুই ভয়াবহ। তাই নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং একই সঙ্গে সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। “নিরাপদ সড়ক সবার অধিকার” এই কথাটি শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং একটি মানবিক দাবি।

নিরাপদ সড়ক বলতে এমন একটি সড়কব্যবস্থাকে বোঝায়, যেখানে পথচারী, চালক ও যাত্রীরা নিশ্চিন্তে চলাচল করতে পারেন এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে। নিরাপদ সড়কের জন্য উন্নত রাস্তা, কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থা, দক্ষ চালক, ফিটনেসবিশিষ্ট যানবাহন, সঠিক সড়কচিহ্ন, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা এবং আইন মেনে চলার সংস্কৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের উন্নয়নের অন্যতম সূচক হলো তার নিরাপদ ও আধুনিক সড়কব্যবস্থা।

বাংলাদেশে প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন। দ্রুতগতির যানবাহন, বেপরোয়া চালনা, অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, যানজট, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং অপর্যাপ্ত তদারকির কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা উদ্বেগজনক। প্রতিদিন সংবাদপত্রে বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল কিংবা অন্যান্য যানবাহনের দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হয়। এসব দুর্ঘটনায় বহু পরিবার তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারায়, অনেক শিশু এতিম হয় এবং অসংখ্য মানুষ সারাজীবনের জন্য শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। ফলে ব্যক্তি, পরিবার এবং জাতীয় অর্থনীতি সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে নানা কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো অসচেতন ও অদক্ষ চালক। অনেক চালক যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই যানবাহন চালান। অতিরিক্ত গতি, মোবাইল ফোন ব্যবহার, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো এবং ওভারটেকিংয়ের প্রবণতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। অনেক যানবাহন যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও রাস্তায় চলাচল করে। নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা না হওয়ায় এসব যানবাহন দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অপরিকল্পিত সড়ক নির্মাণ, ভাঙাচোরা রাস্তা, অপর্যাপ্ত সেতু, ফুটপাতের অভাব এবং ট্রাফিক সিগন্যালের অকার্যকারিতাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। অনেক স্থানে জেব্রা ক্রসিং থাকলেও পথচারীরা তা ব্যবহার করেন না, আবার অনেক চালকও পথচারীদের অগ্রাধিকার দেন না।

নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় সরকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারকে উন্নত মানের সড়ক নির্মাণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। চালকদের যথাযথ প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানা ও শাস্তি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সড়কে সিসিটিভি ক্যামেরা, স্পিড মনিটরিং ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করলে আইন প্রয়োগ আরও কার্যকর হবে। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত সংস্কার ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করাও জরুরি।

নিরাপদ সড়ক গঠনে চালক এবং পরিবহন মালিকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চালকদের অবশ্যই ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে এবং নির্ধারিত গতিসীমা অতিক্রম করা যাবে না। ক্লান্ত বা অসুস্থ অবস্থায় গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে। মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ করে গাড়ি চালানো সম্পূর্ণরূপে পরিহার করতে হবে।
পরিবহন মালিকদের নিয়মিত যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষা করাতে হবে এবং দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক নিয়োগ দিতে হবে। লাভের আশায় অতিরিক্ত যাত্রী বহন বা অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর চাপ দেওয়া উচিত নয়।

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে পথচারীদেরও সচেতন হতে হবে। রাস্তা পারাপারের সময় ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস অথবা জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করা উচিত। চলন্ত যানবাহনের সামনে হঠাৎ রাস্তা পার হওয়া উচিত নয়। মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে করতে রাস্তা পার হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
শিশু ও বয়স্ক ব্যক্তিদের রাস্তা পারাপারে বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। অভিভাবকদের উচিত শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া। পথচারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে দুর্ঘটনার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরাপদ সড়ক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিদ্যালয় ও কলেজে ট্রাফিক আইন এবং সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম আয়োজন করা উচিত। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোটবেলা থেকেই শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং আইন মানার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। তারা নিজেরা সচেতন হলে পরিবার ও সমাজকেও সচেতন করতে পারবে।

টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক প্রচারণা, তথ্যচিত্র, নাটক এবং জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন মানুষের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে।
বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তারা সচেতনতামূলক কর্মসূচি, র‌্যালি, সেমিনার এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
প্রযুক্তির ব্যবহার
আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা আরও উন্নত করা সম্ভব। স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল, সিসিটিভি ক্যামেরা, স্পিড ক্যামেরা, ডিজিটাল জরিমানা ব্যবস্থা এবং জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব। এছাড়া জরুরি চিকিৎসাসেবা দ্রুত পৌঁছে দিতে উন্নত অ্যাম্বুলেন্স ব্যবস্থা এবং হটলাইন সেবা চালু রাখা জরুরি। প্রযুক্তিনির্ভর সড়ক ব্যবস্থাপনা আইন বাস্তবায়নকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে ১৯৯৩ সাল থেকে নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) নানা কর্মসূচি পালন করে আসছে। নিসচার প্রতিষ্ঠাতা চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন-এর নেতৃত্বে নিরাপদ সড়ক চাই-এর কার্যক্রম আজ সবার কাছে সমাদৃত ও প্রশংসিত। নিসচার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করেছেন। এসব আন্দোলনের ফলে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সরকারও বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে কেবল আন্দোলন করলেই হবে না, এর ধারাবাহিক বাস্তবায়ন এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। নাগরিকদেরও প্রতিদিনের জীবনে ট্রাফিক আইন মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখতে হবে। দক্ষ চালক তৈরির জন্য প্রশিক্ষণব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা শিক্ষা এবং প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সড়কে বের হওয়া মানেই অনিশ্চয়তার যাত্রা নয়, বরং প্রতিটি যাত্রা হবে নিরাপদ ও আনন্দময়। একটি প্রাণের মূল্য অনেক, যা পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা সম্ভব নয়। প্রতিটি মানুষের জীবন অমূল্য, প্রতিটি নিরাপদ যাত্রা একটি পরিবারের হাসি, একটি শিশুর ভবিষ্যৎ এবং একটি জাতির সম্ভাবনাকে রক্ষা করে। নিরাপদ সড়ক শুধু দাবি নয়, বরং নিরাপদ সড়ককে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ, উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং নাগরিক জীবনের কেন্দ্রীয় মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। একজন মানুষ যখন ঘর থেকে বের হন, তখন তিনি নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবেন এবং সুস্থভাবে ফিরে আসবেন, এটাই একটি সভ্য রাষ্ট্রের স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু বাস্তবতা অনেক সময় সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের দেশে এমন এক নীরব মহামারিতে রূপ নিয়েছে, যা প্রতিদিন অসংখ্য পরিবারকে শোকাহত করছে, শত শত শিশুকে এতিম করছে এবং বহু মানুষকে আজীবনের জন্য কর্মক্ষমতা হারাতে বাধ্য করছে। অথচ অধিকাংশ দুর্ঘটনাই প্রতিরোধযোগ্য। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়তি নয়, বরং অব্যবস্থাপনা, অসচেতনতা, দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং দায়িত্বহীনতার সম্মিলিত ফল।

নিরাপদ সড়ক একটি সভ্য, উন্নত ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রতিটি মানুষের নিরাপদে চলাচলের অধিকার রয়েছে। এই অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চালক, পরিবহন মালিক, যাত্রী, পথচারী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সর্বস্তরের নাগরিককে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। আইন মেনে চলা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আসুন, আমরা সবাই সড়কে আইন মেনে চলি, অন্যকেও আইন মানতে উৎসাহিত করি। একটি দুর্ঘটনামুক্ত, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ে সবাইকে সচেষ্ট থাকতে হবে।
সবার জীবনের সুরক্ষার জন্য সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। নিরাপদ সড়ক সবার মৌলিক অধিকার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

Archives