পুরনো দামের সিগারেট বিক্রি করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে তামাক কোম্পানি
পুরনো দামের সিগারেট বিক্রি করে রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে তামাক কোম্পানি
বাজেট ঘোষণার দুই মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশের তামাক কোম্পানিগুলো এখনো পুরনো দামের সিগারেট নতুন দামে বিক্রি করে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। অথচ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জারি করা এসআরও তে বলা হয়েছে, পূর্বের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য মুদ্রিত সিগারেটের প্যাকেটে সীল দ্বারা নতুন সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য মুদ্রণ করে দিতে হবে। কিন্তু প্যাকেটে নতুন দামের সীল না দিয়েই বাজারে প্রকাশ্যে সব সিগারেট আগের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এনবিআর ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর সব জেনেও এদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না যা তামাক কোম্পানির অপকৌশলকে সহায়তা করার নামান্তর।

আজ রবিবার (১৬ আগস্ট ২০২৬) সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর সম্মেলন কক্ষে “জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে তামাক কর নীতি”শীর্ষক একটি কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো (বিইআর) ও বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি (বিএনটিটিপি) যৌথভাবে এ কর্মশালার আয়োজন করে।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরোর পরিচালক মাসুদা ইয়াসমিন। কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) ড. মো. এনামুল হক। কর্মশালায় ‘তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ, প্রপাগান্ডা ও বাস্তবতা’ বিষক সেশনে বিএনটিটিপি’র টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য এবং সাংবাদিক ও গবেষক সুশান্ত সিনহা এবং ‘বাংলাদেশের তামাক কর ব্যবস্থা’ বিষয়ক সেশনে বিএনটিটিপি’র প্রকল্প পরিচালক হামিদুল ইসলাম হিল্লোল সহায়ক হিসেবে ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিইআরের তামাক কর প্রকল্পের সিনিয়র প্রজেক্ট ও কমিউনিকেশন অফিসার ইব্রাহীম খলিল।
প্রধান অতিথি ড. মো. এনামুল হক বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি কম্প্রেহেনসিভ তামাক কর নীতি থাকা আবশ্যক। আমরা স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে তামাক কর নীতির রূপরেখাসহ সুপারিশ পাঠিয়েছি। আমরা প্রত্যাশা করি এনবিআর জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও সরকারের কর বৃদ্ধিতে একটি তামাক কর নীতি প্রণয়ন করবে।
অধ্যাপক মাসুদা ইয়াসমিন বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সরকারকে তামাক নিয়ন্ত্রণে আরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। তামাকের ওপর থেকে পর্যায়ক্রমে নির্ভরতা কমিয়ে এনে বিকল্পভাবে রাজস্ব আদায়ের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। তামাকের কারণে রাজস্বের চেয়ে স্বাস্থ্য ব্যয় অনেক বেশি। সুতরাং কীভাবে তামাকে আরও বাস্তবিকভাবে কর বৃদ্ধি করা যায় সেটার উপায় বের করতে হবে। পাশাপাশি সবসময় সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য খাতে সরকারের গুরুত্বারোপ করতে হবে।
কর্শালায় হামিদুল ইসলাম হিল্লোল বলেন, তামাক কোম্পানি তামাকজাত দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে চোরাচালানের মিথ্যা তথ্য ছড়ায়। গবেষণায় দেখা গেছে, চোরাচালান সংক্রন্ত সংবাদগুলো অধিকাংশই হুবহু একই ধরনের এবং দায়ী ব্যাক্তিদের খুঁজে পাওয়া যায়না এবং এসব ঘটনায় কাউকে আটক করতেও দেখা যায় না। আবার সারা বছর চোরাচালানের খবর না থাকলেও জাতীয় বাজেটের ঠিক আগে দু-এক মাস তা বেশি বেশি দেখা যায়। এর পেছনে তামাক কোম্পানির হাত আছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি আরও বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশে সিগারেটের দাম অনেক কম। ফলে এ ধরনের সিগারেট চোরাচালানের মিথ্যা ও সাজানো তথ্য কেবল বিভ্রান্ত করার জন্যই প্রচার করছে তামাক কোম্পানি। সরকারের উচিত বাজেট প্রস্তাবনা থেকে তদুর্ধ্ব শব্দের বিলুপ্তি করে তামাকজাত দ্রব্যে সুনির্দিষ্ট করারোপ করা এবং একটি জাতীয় কর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা।
কর্মশালায় সুশান্ত সিনহা বলেন, বাজেট পাশ হওয়ার পর দ্রুত সময়ে নতুন দামের সিগারেট বাজারে নিয়ে আসার কথা থাকলেও সেটা প্রতিপালন করছে না তামাক কোম্পানি। বরং পুরনো দামের সিগারেট প্রতিদিন বিক্রেতাদের সরবরাহ করে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে তারা। সরকার দ্রুত নতুন দামের প্যাকেটের সিগারেট বাজারে নিয়ে আসার আদেশ দিলেও তামাক কোম্পানিগুলো জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪ মাসেরও বেশি সময় পুরনো সিগারেট বিক্রি করে রাজস্ব ফাঁকি দেয়।
তিনি আরও বলেন, তামাকজাত দ্রব্যে রাজস্ব ফাঁকি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বর্তমানে প্রচলিত বহুস্তরভিত্তিক অ্যাডভেলরেম কর কাঠামো। সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধিতে এ পদ্ধতির পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট তামাক কর কাঠামোর প্রচলন করতে হবে। একইসঙ্গে এমআরপির চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রি বন্ধে এনবিআর ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
কর্মশালায় বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমের ২০ জন গণমাধ্যমকর্মী অংশগ্রহণ করেন। এসময় তারা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও তামাকজাত দ্রব্যে কর বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কর্মপরিকল্পনার সুপারিশ করেন। কর্মশালাটি সঞ্চালনা করেন বিইআরের সিনিয়র প্রজেক্ট ও কমিউনিকেশন অফিসার ইব্রাহীম খলিল।







