‘সাম্প্রদায়িক উস্কানী প্রতিরোধ করি, সকল নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিত করি’-এই প্রতিপাদ্যের আলোকে মানববন্ধন কর্মসূচী অনুষ্ঠিত
আজ ০৭ অক্টোবর, বুধবার বিকাল ৩:৩০ টায় প্রেসক্লাবের সামনে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে ‘সাম্প্রদায়িক উস্কানী প্রতিরোধ করি, সকল নাগরিকের মানবাধিকার নিশ্চিত করি’- এই প্রতিপাদ্যের আলোকে সনাতন ধর্মালম্বীদের প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দূর্গোৎবের প্রাক্কালে প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে মানব বন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম; লিগ্যাল এইড সম্পাদক রেখা সাহা এবং ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক কানিজ ফাতেমা টগর। সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রোগ্রাম অফিসার নুরুন নাহার তানিয়া। মানব বন্ধন কর্মসূচিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির নেত্রীবৃন্দ; সম্পাদকমন্ডলী, কর্মকর্তাগণ এবং সাংবাদিকসহ প্রায় ৭০ জন উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ৫৭ টি জেলাশাখায় আজ এই মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন ধর্ম যার যার, উৎসব সবার- এটি বাস্তবে নিশ্চিত করতে সরকারকে সম্মিলিতভাবে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং ঘৃণা ছড়ানোর প্রবণতা বিভিন্ন মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমে এ ধরনের বক্তব্য ও প্রচারের বিস্তার উদ্বেগজনক। এর প্রভাব বাস্তব জীবনেও পড়ছে। বক্তারা আরো বলেন দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিমা ভাংচুরের ঘটনা ঘটছে, এর সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম চলছে উসকানিমূলক প্রচারণা। অন্যদিকে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্মেও বৃদ্ধিতে সহিংসতার ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। এসকল সহিংসতায় ০২ থেকে ৮০ বছরের মানুষ কেউ ই রেহাই পাচ্ছেনা। এভাবে একটি উচ্ছৃংখল গোষ্ঠী সমাজে বিদ্বেষ,ভয় এবং অস্থিরতা তৈরি করে মানুষে মানুষে বিভেদ তৈরি করতে চায়। এরা সংখ্যায় বেশি নয়। এদের প্রতিহত করতে সম্প্রীতি ও শান্তিকামী নাগরিকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান বক্তারা। পাশাপাশি বাংলার আবহমান সংস্কৃতিতে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মিলে মিলে বসবাস করার ধারাকে সমুন্নত রাখতে সকল ধর্মকে সম্মান করে চলার দাবি জানানো হয়।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, ধর্মীয় উৎসব পালনের সুযোগ ও অধিকার পাওয়ার জন্য কাউকে রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানাতে হবে এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা কাম্য নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম চেতনা ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা। পাকিস্তানি শাসন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিসত্তা গড়ে তোলার অদম্য আকাঙ্খা থেকেই বাংলাদেশের অভ্যুদয়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা এই চেতনার বিরোধিতা করেছিল, তাদের বিভিন্ন তৎপরতা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার পেছনে শুধু ধর্মীয় কারণই থাকে না উল্লেখ করে তিনি এসময় বলেন, জমি দখল, ব্যক্তিগত বিরোধ, সম্পদ লুট কিংবা রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তারের মতো নানা কারণেও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতার ঘটনা ঘটতে পারে। অনেক সময় ধর্মীয় পরিচয়কে এসব কর্মকান্ডের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শুধু সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান সুযোগ রয়েছে এ কথা বললেই হবে না; সেই অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপও নিতে হবে। তিনি আরও বলেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রাষ্ট্রকে আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক পরিবেশ তৈরিতেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। আসন্ন দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় পূজাকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য হামলা বা বিশৃঙ্খলার বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সব নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করার যে ঘোষণা রয়েছে, তার বাস্তবায়নে যাতে কোন ব্যত্যয় না ঘটে সেজন্য রাষ্ট্রের প্রতি জোর দাবি জানান। একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, কোনো উসকানিমূলক বা বিভাজন সৃষ্টিকারী বক্তব্য প্রচার না করে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দেয়ায় গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি বাঙালি জাতিসত্তার অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর এই উৎসবকে সামনে রেখে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। কারণ, সারা বছরই বিভিন্ন সময়ে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা, উসকানিমূলক বক্তব্য, বিদ্বেষমূলক প্রচার ও সহিংস কর্মকান্ডের ঘটনা দেখা যায়। এর ফলে বিভিন্ন সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয় এবং অনেকের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্ক তৈরি হয়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, হামলা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ অবস্থায় সাম্প্রদায়িক ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং সহিংস কর্মকান্ড প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে বলেন, রাষ্ট্র যথাযথভাবে এ ধরনের কর্মকান্ড প্রতিরোধে ব্যবস্থা না নিলে অপরাধীরা আরও উৎসাহিত হতে পারে, যার প্রভাব সামগ্রিক সমাজে পড়ে। দুর্গাপূজা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি দেশের মানুষের অংশগ্রহণে একটি সামাজিক ও সম্প্রীতির উৎসবেও পরিণত হয়েছে। তাই এ উৎসব নির্বিঘœ, নিরাপদ ও আনন্দময়ভাবে পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি এসময় এমন একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতিপূর্ণ সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও অধিকার নিয়ে নিশ্চিন্তে বসবাস করতে পারবেন এবং স্বাধীনভাবে ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠান পালন করতে পারবেন। পাশাপাশি আসন্ন দুর্গাপূজায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতি ও মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখিয়ে সবাইকে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের পরিবেশ বজায় রাখার আহ্বান জানান।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সীমা মোসলেম বলেন, প্রতিবছর শারদীয় দূর্গোৎবের প্রাক্কালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার আহ¦ান জানিয়ে মানববন্ধনে দাড়ানো খুবই দু:খজনক। দেশ স্বাধীনে জাতি, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অবদান থাকলেও আজ নাগরিক হিসেবে দেশে বসবাসের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয়। পুলিশি পাহারায় উৎসব উদযাপন কখনো স্বস্তিদায়ক হতে পারেনা। যেকোন হামলার ঘটনায় সরকার পদক্ষেপ নেয় কিন্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত প্রচার হতে থাকা উসকানীমূলক বক্তব্য বন্ধে তেমন কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেই। গত দুই বছরে মবের উত্থান এসব অনাকাংিখত ঘটনার বিস্তার আরো বৃদ্ধি করেছে। এভাবে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়া হচ্ছে। এসকল বিষয়ের প্রতি তিনি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।







