আইনশৃঙ্খলাকে বুড়ো আঙুল: বহিরাগত ক্যাডার এনে রাকিন সিটিতে তাণ্ডব, আতঙ্কে শত শত পরিবার!
রাজধানীর মিরপুর, কাফরূলে অবস্থিত মেগা আবাসন প্রকল্প ‘বিজয় রাকিন সিটি’ (কাশফুল সিটি)-তে নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলা, অবরুদ্ধকরণ ও চরম তাণ্ডবের ঘটনা ঘটেছে। আজ ১ আগস্ট ২০২৬, শনিবার সকাল আনুমানিক ৯:০০ টার দিকে একাধিক বাস ও মাইক্রোবাসে করে আসা বিপুলসংখ্যক বহিরাগত সশস্ত্র ক্যাডার কমপ্লেক্সে প্রবেশ করে পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে ফেলে। শান্তিকামী ফ্ল্যাট মালিক ও সাধারণ বাসিন্দাদের ওপর চালানো এই নগ্ন আক্রমণের নেপথ্যে রয়েছে ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ‘রাকিন ডেভলপার্স’-এর মালিকপক্ষ, তাদের নিযুক্ত দুই কর্মকর্তা (সাবেক সেনাসদস্য) রশিদুল আলম ও আবুল কালাম আজাদ, দুর্নীতিবাজ প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজ এবং ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা এক হিংস্র চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের যৌথ চক্রান্ত।
ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রজেক্টের শুরু থেকেই ‘রাকিন ডেভলপার্স’ চুক্তি অনুযায়ী কাজ শেষ করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। মেগা এই প্রজেক্টে এখনো রয়ে গেছে প্রচুর অসমাপ্ত কাজ এবং ভয়াবহ নির্মাণ ত্রুটি। ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ ফাটল, নিচু মানের অবকাঠামো ও সার্ভিস লাইনের বেহাল দশায় বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। তার চেয়ে বড় বিষয় হলো, ফ্ল্যাটের শতভাগ মূল্য পরিশোধ করা সত্ত্বেও ফ্ল্যাট মালিকদের রেজিস্ট্রেশন ও হস্তান্তরের বিষয় বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রেখেছে রাকিন কর্তৃপক্ষ।
আইন ও রিহ্যাবের নিয়ম অনুযায়ী, প্রজেক্টের নির্মাণকাজ শতভাগ শেষ করে তা নিবন্ধিত সোসাইটি বা জমির মালিক সমিতির নিকট বুঝিয়ে দিয়ে প্রস্থান করাই ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব। অথচ রাকিন ডেভলপার্স আজ পর্যন্ত তাদের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেনি এবং কোনো স্থাপনা আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করেনি। নিজেদের এই অবকাঠামোগত ব্যর্থতা, নির্মাণ ত্রুটি, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রি না দেওয়ার প্রতারণা এবং আর্থিক অনিয়ম ধামাচাপা দিতেই তারা হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আসছে।
প্রজেক্ট হস্তান্তরের আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পূর্বে রাকিনের অনাপত্তি (NOC) নিয়ে সমবায় অধিদপ্তর থেকে নিবন্ধিত হয় ফ্ল্যাট মালিকদের একমাত্র বৈধ সংগঠন বিজয় রাকিন ‘সিটি অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি’। কোনো ঝামেলা ছাড়া এতদিন এই সোসাইটিই সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে ও সুনামের সাথে সিটি পরিচালনা করে আসছিল। কিন্তু পরবর্তীতে রাকিন ডেভলপার্স প্রজেক্ট হস্তান্তরের স্বাভাবিক পথ বন্ধ করে বেআইনিভাবে পুরো সিটির ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব দখলের চক্রান্তে নামে। সেই লক্ষ্যে তারা নিবন্ধিত ‘সিটি অ্যাপার্টমেন্ট ওনার্স কো-অপারেটিভ সোসাইটি’-র কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে তাণ্ডব চালায় এবং নামফলক ও সাইনবোর্ড ভেঙে চুরমার করে দেয়।
অফিস ভেঙে আইনসম্মত সোসাইটিকে বলপ্রয়োগ করে উচ্ছেদ করার পরই রাকিন বেআইনিভাবে তথাকথিত ‘সার্ভিস চার্জ’ আদায়ের অবৈধ নাটক ফাঁদে। পাশাপাশি, মূল নিবন্ধিত সোসাইটিকে চিরতরে পঙ্গু করতে রাকিনের কর্মকর্তা রশিদুল আলম ও আবুল কালাম আজাদের মদদে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দিয়ে সিটিতে ভীতি সৃষ্টি করা হয় এবং একটি বেআইনি ‘পকেট অ্যাসোসিয়েশন’ দাঁড় করানো হয়।
আইনসম্মত সমিতির নেতাদের কোনো হুমকি দিয়ে কাবু করতে না পেরে পরবর্তীতে রাকিন কর্মকর্তা রশিদুল-আজাদ হাত মেলায় স্থানীয় এক সশস্ত্র চাঁদাবাজ চক্রের সাথে। এই ক্যাডার চক্রটি সিটির ‘মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি (এমএমপিকেএস)’-এর নিকট সরাসরি ১ (এক) কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে। সমিতি এই অবৈধ চাঁদা দিতে সরাসরি অস্বীকার জানালে চাঁদাবাজ চক্রটি চরম ক্ষুব্ধ হয়ে রাকিনের কর্মকর্তা রশিদুল ও আজাদের সাথে পুরোপুরি আঁতাত করে। গত ২০২৪ সালের ২৩শে ডিসেম্বর তারা বহিরাগত গুন্ডাবাহিনী এনে কমপ্লেক্সের মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির অফিসে হামলা চালিয়ে কৃত্রিম ‘মব’ তৈরি করে। সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলম এবং দপ্তর সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু ভাইকে সাজানো মামলায় কারাবন্দি করা হয় এবং সভাপতি এ. টি. আহমদুল হক চৌধুরীসহ অন্যান্যদের ভয় দেখিয়ে অফিসটি জবরদখল করা হয়।
মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতির অফিসটি জোরপূর্বক দখল করার পরই রাকিন কর্তৃপক্ষ, তাদের পোষ্য কুশীলব এবং চিহ্নিত চাঁদাবাজ চক্রটি এক হয়ে গভীর চক্রান্তে মেতে ওঠে। তারা সমাজসেবা অধিদপ্তরের একশ্রেণীর অসৎ ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার সাথে অনৈতিক যোগসাজশ গড়ে তোলে। কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে একতরফা ও বেআইনিভাবে সেখানে সরকারি প্রশাসক নিয়োগের ব্যবস্থা করা হয়, যাতে সমিতির স্বাভাবিক ও স্বাধীন কার্যক্রম চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া যায়।
এই কারসাজির অংশ হিসেবে প্রথম দফায় প্রশাসক হন সাবেক অতিরিক্ত সচিব আবু মাসুদ। কিন্তু তিনি চেয়ারে বসেই ওই চাঁদাবাজ চক্রের সাথে হাত মিলিয়ে সমিতির তহবিল থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। পরবর্তীতে তাঁর এই ভয়াবহ দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তর বাধ্য হয়ে আবু মাসুদকে পদ থেকে অপসারণ করে।তবে চক্রান্তকারীরা দমে যায়নি। আবু মাসুদের অপসারণের পর সেই একই অসৎ কর্মকর্তাদের সহায়তায় দ্বিতীয় দফায় প্রশাসক বানিয়ে আনা হয় ইশতিয়াক আজিজ-কে, যিনি দুর্নীতির দায়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) থেকে ইতিপূর্বে বহিষ্কৃত। তিনি দায়িত্ব নিয়েই সেই চিহ্নিত চাঁদাবাজদের সাথে আঁতাত করে সমিতির প্রথম প্রশাসকের মতো বর্তমান বিতর্কিত প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজও সশস্ত্র চাঁদাবাজ চক্রটির সাথে মিলে সমিতির তহবিল থেকে পুনরায় কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ ও তসরুফ করেন।
প্রশাসকদের একের পর এক অর্থ আত্মসাৎ, ভয়াবহ দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা রাজপথে বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরকে আর্থিক দুর্নীতির স্পষ্ট লিখিত প্রমাণাদি দেওয়া সত্ত্বেও তারা রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি; উল্টো ইশতিয়াক আজিজকে বারবার পুনঃনিয়োগ দিয়ে পদে বহাল রাখছে। মূলত ইশতিয়াক আজিজকে বকলমে ব্যবহার করে রাকিন কর্মকর্তা ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট পুরো সিটি গ্রাস করার চক্রান্ত বাস্তবায়ন করে আসছে।
রাকিনের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে ফ্ল্যাট মালিকরা সিটির টেনিস কোর্টে দীর্ঘ ৮ দিন ধরে একটানা অহিংস গণ-অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। আজ ১ আগস্ট সকালে কর্মসূচিটি সাময়িকভাবে শিথিল করা মাত্রই ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা সুযোগ নেয়। সকাল ৯:০০ টার দিকে ইশতিয়াক আজিজ এবং রাকিন কর্মকর্তা রশিদুল ও আজাদের ইশারায় বাসে করে বিপুলসংখ্যক বহিরাগত ক্যাডার বাহিনী সিটিতে প্রবেশ করে তাণ্ডব চালায় ও তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করে।
সংবাদ পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালে বহিরাগতরা সাময়িকভাবে সরে গেলেও পুরো এলাকায় এখনো থমথমে পরিস্থিতি ও চরম নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী বাসিন্দারা অনতিবিলম্বে জামুকা থেকে বহিষ্কৃত ও কোটি কোটি টাকা অর্থ তসরুফে অভিযুক্ত প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজকে বরখাস্ত ও গ্রেপ্তার, সাবেক প্রশাসক আবু মাসুদ ও ইশতিয়াক আজিজের আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধার, চক্রান্তকারী কর্মকর্তা রশিদুল আলম ও আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা, চাঁদাবাজ চক্রকে গ্রেপ্তার, ঝুলে থাকা রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন ও প্রজেক্ট হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করা এবং প্রতারক প্রতিষ্ঠান রাকিন ডেভলপার্সের সার্বিক অনিয়মের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্তের জোর দাবি জানিয়েছেন।