৫ই আগস্ট: রক্তে লেখা ট্র্যাজেডি ও পুলিশের আত্মত্যাগ : কবি মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলু
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট—বাংলাদেশের ইতিহাসের রক্তস্নাত পাতায় এক পরম বিভীষিকাময় অধ্যায়। একদিকে ক্ষমতার মসনদ বদলের উত্তাল রাজপথ, অন্যদিকে মানবতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ওপর নেমে আসা এক অমানসিক অন্ধকারের তাণ্ডব। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে একদল উগ্র দুষ্কৃতকারী ও সুযোগসন্ধানী হিংস্র মব মেতে উঠেছিল ইতিহাসের অন্যতম পৈশাচিক প্রতিশোধখেলায়। দেশের বিভিন্ন থানা ও পুলিশি স্থাপনায় সেদিন যে নজিরবিহীন অগ্নিসংযোগ, তাণ্ডব আর অমানুষিক গণহত্যা চালানো হয়েছিল, তা কেবল প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর হামলা ছিল না—তা ছিল সভ্যতার মুখে এক চরম চপেটাঘাত এবং স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্তিত্বের ওপর এক গভীর ও চিরস্থায়ী ক্ষত।
তথ্য মাধ্যম ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিশ্লেষকদের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, পুলিশ বাহিনীর ওপর চালানো এই সুপরিকল্পিত ও হিংসাত্মক আক্রমণের মূল নীল নকশা ছিল—দেশের প্রধান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবলকে একঝটকায় চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার এই প্রতীককে সম্পূর্ণ ‘পুলিশহীন’ করে তোলা। থানা জ্বালিয়ে ছাই করা, বিপুল অস্ত্র লুট করা এবং দায়িত্বপালনরত সদস্যদের পিটিয়ে ও কুপিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করার পেছনে ছিল দেশজুড়ে এক অভূতপূর্ব ‘নিরাপত্তা শূন্যতা’ (Security Vacuum) তৈরির গভীর চক্রান্ত। বস্তুত, পুলিশ সদস্যদের ওপর এই পৈশাচিক গণহত্যা চালিয়ে এবং মাঠপর্যায়ের প্রতিটি প্রধান নিরাপত্তাকেন্দ্র গুঁড়িয়ে দিয়েই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের মূল ভিতকে এক লহমায় পঙ্গু ও অচল করে দেওয়া হয়েছিল। একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মূল ঢালকে যখন এভাবে নির্মম রক্তপাতে ধূলিসাৎ করা হয়, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের অবশিষ্টাংশ সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গ ও অকার্যকর হয়ে পড়তে বাধ্য হয়—এবং মূলত পুলিশকে হত্যার মধ্য দিয়ে তৈরি করা এই অভূতপূর্ব নৈরাজ্যই তৎকালীন সরকারের চূড়ান্ত ও অতিত্বরিত পতন নিশ্চিত করেছিল। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ও আইনের শাসনকে ধূলিসাৎ করে পুরো দেশকে চরম নৈরাজ্য ও সার্বভৌম সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়ার এমন ভয়াবহ নজির ইতিহাসে বিরল।
সেদিন বিকেল গড়াতেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসতে থাকে নিরপরাধ মানুষের কান্নার বুকফাটা আর্তনাদ। ঢাকাসহ দেশের অন্তত ২৬টি থানা ও বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনা মুহূর্তে রূপ নেয় জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপে। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ও খিলগাঁও থানা থেকে শুরু করে প্রান্তিক জনপদ-সর্বত্রই ধেয়ে গিয়েছিল উগ্র সহিংসতার এক বিনাশী ঝড়। সবচেয়ে ভয়াবহ গণহত্যা ঘটেছিল সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায়, যেখানে প্রাণ বাঁচাতে আকুতি জানানো ১৩ জনেরও বেশি পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে পৈশাচিকভাবে হত্যা করা হয়। বাদ যায়নি হবিগঞ্জের বানিয়াচং, টাঙ্গাইলের গোড়াই, কুমিল্লার ইলিয়টগঞ্জ, বগুড়ার শেরপুর কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থানা। নারায়ণগঞ্জ, বগুড়া ও পাবনার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। জ্বলন্ত আগুনের লেলিহান শিখা আর বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে আটকা পড়া পুলিশ সদস্যদের শেষ আকুতি চাপা পড়ে গিয়েছিল উন্মত্ত জনতার এক বিকৃত তাণ্ডব ও ধ্বংসাত্মক উল্লাসে।
যে কনস্টেবলটি হয়তো সকালে সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বলে এসেছিলেন, “রাতে ডিউটি শেষ করে দ্রুত বাড়ি ফিরব,” কিংবা যে কর্মকর্তাটি কয়েকদিন পর ছুটিতে গিয়ে বৃদ্ধ মায়ের মুখটি দেখবেন বলে ভাবছিলেন—তাদের কেউ আর ফেরেননি। উগ্র মব তাদের শুধু হত্যাই করেনি, কোথাও কোথাও লাশ ঝুলিয়ে রেখে মেতেছিল চরম পাশবিক উন্মাদনায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকলেও দিনশেষে তারা তো রক্তমাংসের মানুষ—কারও পিতা, কারও সন্তান, কারও পরম প্রিয় ভাই। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এমন পৈশাচিক পরিস্থিতির শিকার হওয়া পুরো জাতির বিবেক, মূল্যবোধ ও অনুশোচনাকে চিরতরে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
রাজনীতি, ক্ষোভ বা আন্দোলনের যুক্তি যা-ই থাক না কেন, মব জাস্টিসের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারা, কুপিয়ে হত্যা করা কিংবা পৈশাচিক উল্লাস প্রকাশ করা কোনো স্বাধীন দেশ বা সভ্য সমাজের পরিচয় হতে পারে না। এই ধরনের সুপরিকল্পিত গণহত্যা, অরাজকতা ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ধ্বংস করার মতো গুরুতর অপরাধের কোনো ক্ষমা হতে পারে না। কোনো স্বাধীন দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এই পৈশাচিক হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করে দেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনের অধীনে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্র ও সভ্যতার বিরুদ্ধে সংঘটিত এমন জঘন্যতম মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড বা চরম শাস্তির বিধানই হতে পারে একমাত্র দৃষ্টান্তমূলক বিচার-যা ভবিষ্যতে যেকোনো উগ্র মব বা নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীর জন্য এক কঠোর হুঁশিয়ারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ৫ই আগস্টের এই রক্তাক্ত ট্র্যাজেডি আমাদের অস্থিমজ্জায় এই চিরন্তন সত্য শিক্ষা দিয়ে গেছে—আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি একটি জাতির জন্য কতটা আত্মঘাতী হতে পারে।
ইতিহাসের এই রক্তস্নাত অধ্যায় যেন কেবল গ্লানি ও ক্ষোভের সাগরে হারিয়ে না যায়, বরং এটি যেন আমাদের আত্মসংযম, উগ্রতা রোধ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সুরক্ষার চরম শিক্ষা দেয়। এই মহৎ আত্মত্যাগকে চিরভাস্বর করে রাখতে এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রতীকদের সম্মান জানাতে ৫ই আগস্ট দিনটিকে জাতীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে “পুলিশ আত্মত্যাগ দিবস” হিসেবে ঘোষণা করা সময়ের দাবি। প্রতি বছর এই দিনে দেশের সকল পুলিশ সদর দপ্তর ও থানায় জাতীয় এবং পুলিশি পতাকা অর্ধনমিত রাখা, পুষ্পস্তবক অর্পণ, বিশেষ নীরবতা পালন এবং শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা আবশ্যক। একই সাথে, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন বিসর্জন দেওয়া পুলিশ পরিবারগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসন নিশ্চিত করা, বিচারিক প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত থানায় স্মারক ফলক স্থাপনের মাধ্যমে মব সহিংসতার বিরুদ্ধে তীব্র নাগরিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার।
আজকের এই স্মরণের দিনে, ৫ই আগস্টের রক্তক্ষয়ী তাণ্ডবের বিরুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করা প্রতিটি পুলিশ সদস্যের স্মৃতির প্রতি জানাই গভীরতম শ্রদ্ধা। “পুলিশ আত্মত্যাগ দিবস” প্রতিটি নাগরিকের অন্তরে এই সুদৃঢ় প্রজ্ঞা জাগিয়ে তুলুক-প্রতিশোধ ও উগ্রতার আগুন কখনোই কোনো দেশ বা জাতিকে সমৃদ্ধি দিতে পারে না; কেবল আইন, দৃষ্টান্তমূলক বিচার, মানবিকতা আর পরম সহনশীলতাই একটি স্বাধীন দেশকে দিতে পারে সুরক্ষিত ও সুন্দর ভবিষ্যৎ।
লেখক পরিচিতি





