তামাক পণ্যের দাম বৃদ্ধির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন
বাংলাদেশে তামাক পণ্যের ব্যবহার একটি মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ২০ Att-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তামাক পণ্যের ওপর কার্যকর কর ও মূল্য বৃদ্ধির জোর দাবি জানানো হয়েছে। আজ ‘জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাক পণ্যে কার্যকর দাম বৃদ্ধি: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে নারীদের বাজেট ভাবনা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য ও দাবিগুলো তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক বন্ধুদের উদ্দেশে লিখিত বক্তব্যে দেশের বর্তমান তামাক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং আসন্ন বাজেটের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়।
তামাকের ভয়াবহ থাবা ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি
বক্তব্যে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কোনো না কোনোভাবে তামাক ব্যবহার করছেন। পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের মধ্যেও তামাক ব্যবহারের হার উদ্বেগজনক। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও তামাকের প্রবণতা বাড়ছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় ঢাকার আশেপাশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের শরীরে উচ্চমাত্রার নিকোটিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা পরোক্ষ ধূমপানের মারাত্মক প্রভাব নির্দেশ করে। তামাকজনিত রোগে দেশে প্রতি বছর প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ অকালে মৃত্যুবরণ করছেন।
রাজস্বের চেয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতি দ্বিগুণেরও বেশি
সংবাদ সম্মেলনে ২০২৪ সালের একটি গবেষণার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়, তামাকের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশাল ক্ষতি হচ্ছে। ২০২৪ সালে তামাক ব্যবহার ও উৎপাদনের কারণে স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে তামাক খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় হয়েছে মাত্র প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, তামাক থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের তুলনায় এর কারণে হওয়া স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে তামাককে শুধু রাজস্ব আয়ের উৎস ভাবা বাস্তবসম্মত নয়, বরং এটি দেশের উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য খাত সংস্কারের বড় বাধা।
বর্তমান জটিল কর কাঠামো ও ত্রুটি
বক্তারা দেশের বর্তমান চার স্তরবিশিষ্ট (নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম) জটিল সিগারেট কর কাঠামোর সমালোচনা করেন। তারা বলেন, এই ব্যবস্থার কারণে ধূমপায়ীরা কম মূল্যের স্তরে স্থানান্তরের সুযোগ পাচ্ছে, যা তামাক ব্যবহার নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে বহাল রাখছে। এছাড়া চাল, ডাল, তেল বা ডিমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাজারে যেভাবে বাড়ছে, তার তুলনায় সিগারেটের দাম অনেক কম বেড়েছে। ফলে তরুণ ও নিম্নআয়ের মানুষের কাছে সিগারেট আরও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি জর্দা ও গুলের মতো ধোঁয়াবিহীন তামাক পণ্যও অত্যন্ত সস্তা ও সহজে পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা
তামাক পণ্যের সহজলভ্যতা কমাতে এবং কর কাঠামো সহজ করতে সংবাদ সম্মেলনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের জন্য নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলো পেশ করা হয়:
সিগারেটের স্তর একীকরণ: নিম্ন ও মধ্যম স্তরকে একত্রিত করে প্রতি ১০ শলাকা সিগারেটের মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করা।
উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তর: উচ্চ স্তরের ১০ শলাকা সিগারেটের মূল্য ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের মূল্য ২০০ টাকা নির্ধারণ করা।
সুনির্দিষ্ট কর (Specific Tax): কর কাঠামোর জটিলতা কমাতে সব স্তরে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপ করা।
ধোঁয়াবিহীন তামাক (জর্দা ও গুল): প্রতি ১০ গ্রাম জর্দার মূল্য ৬০ টাকা এবং গুলের মূল্য ৩৫ টাকা নির্ধারণ করে উভয়ের ওপর ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা। এছাড়া প্রতি ১০ গ্রামে ২ টাকা সুনির্দিষ্ট কর ধার্য করা।
বিড়ি: বিড়ির ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভাজন তুলে দিয়ে প্রতি ২০ শলাকা বিড়ির মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ এবং ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আশাপ্রকাশ করেন যে, এই প্রস্তাবনাগুলো আসন্ন বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হলে তামাকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমবে, রাজস্ব আদায় আরও কার্যকর হবে এবং সর্বোপরি দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হবে।






