সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
পাহাড়ে জুমের গন্ধ, মেঘের বসতি এবং একটি আত্মপরিচয়ের লড়াই ছন্দ সেন চাকমা যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে বিজয়ী কাউন্সিলর রানা রহমানকে অভিনন্দন ​সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ছাড়া বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব: জাতীয় প্রেস ক্লাবে মতবিনিময় সভা তামাক পণ্যের দাম বৃদ্ধির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন আমানতের আর্তনাদ কঠোর ভাবে মব জাস্টিস প্রতিরোধের আহ্বান ৮০-৯০ দশক ছাত্রনেতাদের রাজস্ব আয়ের খাত নয় টেলিযোগাযোগকে সেবার খাত হিসেবে দেখার আহ্বান টিক্যাবের তেজগাঁও কলেজ ছাত্র অধিকার পরিষদের আংশিক কমিটি গঠন ​শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সেমিনার অনুষ্ঠিত শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেই দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হবে মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ

​সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ছাড়া বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব: জাতীয় প্রেস ক্লাবে মতবিনিময় সভা

​স্টাফ রিপোর্টার , ঢাকা: / ১০ Time View
Update : রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে বহুমুখী ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এখন একটি সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা (Integrated Environmental Management) গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে একক কোনো খাতের উন্নয়ন না করে নদী অববাহিকা, পরিবেশ, কৃষি ও নগরায়ণকে একটি সামগ্রিক কাঠামোর অধীনে এনে নীতি নির্ধারণ করার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
​গত ১৭ই মে জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আয়োজিত ‘সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা’ বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় মূল প্রবন্ধে এসব তথ্য ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়। ‘বাংলাদেশের সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা: ব-দ্বীপভিত্তিক উন্নয়ন, নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা, বনায়ন ও জলবায়ু সহনশীল নগরায়ণের জন্য একটি পদ্ধতিগত নীতিকাঠামো’ শীর্ষক এই প্রবন্ধটি পাঠ করেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের সাবেক অধ্যাপক ড. মাহমুদুল ইসলাম।
​জলবায়ু পরিবর্তন: বাংলাদেশের প্রধান ‘দুর্যোগ ঝুঁকি বর্ধক’
​মূল প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সক্রিয় ব-দ্বীপ অঞ্চল হওয়ায় এটি প্রাকৃতিকভাবেই বন্যা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগপ্রবণ। আইপিসিসি (IPCC)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমানে বাংলাদেশের জন্য একটি প্রধান ‘দুর্যোগ ঝুঁকি বর্ধক’ (Disaster threat multiplier) হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে দেশের কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবেশগত অবক্ষয় দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে বহুমাত্রিক ঝুঁকিতে ফেলছে।
​পরিবেশের প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ
​প্রবন্ধে বাংলাদেশের পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে ৯টি প্রধান চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করা হয়েছে:
১. নদী অববাহিকায় নদীভাঙন ও নাব্যতার সংকট।
২. উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে পাহাড়ধস।
৪. জলাভূমি ও বনাঞ্চল হ্রাস।
৫. নগর এলাকায় বায়ু ও পানি দূষণ।
৬. কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার তীব্র সংকট।
৭. অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণ।
৮. জলবায়ুজনিত কারণে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বৃদ্ধি।
৯. কৃষি উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি।
​পরিসংখ্যান টেনে বলা হয়, ১৯৮৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে রাজধানী ঢাকার প্রায় ৫৬% সবুজ এলাকা হারিয়ে গেছে। এছাড়া বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২৩,৬৮৮ টন পৌর বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার প্রায় ৭০% বর্জ্যই সঠিক ব্যবস্থাপনার বাইরে থেকে যায়।
​সমাধানের ৬টি মূল স্তম্ভ ও প্রস্তাবিত ‘ক্লাস্টার সিস্টেম’
​এই সংকট উত্তরণে প্রবন্ধকার একটি সমন্বিত শাসনব্যবস্থা ও ক্লাস্টারভিত্তিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জোর দাবি জানান। বাংলাদেশে পরিবেশ, পানি ও কৃষি খাতের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৭৭টিরও বেশি সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে কাজের সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণে একটি “Cluster System” এবং “Systems Thinking” কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মূল উপাদানগুলো হলো:
​নদী অববাহিকা ভিত্তিক আঞ্চলিক শাসন ব্যবস্থা (Regional Governance Cluster)।
​পরিকল্পনা কমিশনের অধীনে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় সেল।
​জিআইএস (GIS) ভিত্তিক যৌথ তথ্য প্ল্যাটফর্ম।
​বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ডেল্টা কোঅর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্ম।
​যৌথ বাজেট ও মনিটরিং ব্যবস্থা।
​বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটির সম্পৃক্ততা।
​এছাড়া দেশের দীর্ঘমেয়াদি পানি ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নের মূল ভিত্তি হিসেবে ‘বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০’ (BDP 2100) এর আলোকে উপকূলীয় অঞ্চল, নদী ও মোহনা, হাওড়, খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং নগর অঞ্চল—এই ৬টি ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়।
​ভবিষ্যৎ করণীয় ও সুপারিশ
​সংকট মোকাবিলায় নীতিগত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয় সভায়:
​প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান (NbS): উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বনায়ন সম্প্রসারণ, খালি জায়গায় সামাজিক বনায়ন এবং নদী তীরে বনায়নের মাধ্যমে ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি কমানো।
​স্মার্ট মনিটরিং: ডিজিটাল পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় জিআইএস, স্যাটেলাইট এবং স্মার্ট ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করা।
​পুনর্জাগরণমূলক কৃষি: জলবায়ু সহনশীল ও লবণাক্ততা-সহিষ্ণু ফসল চাষ এবং জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধি।
​কার্বন বাণিজ্য: কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন এবং REDD+ প্রজেক্টের মাধ্যমে জলবায়ু অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো।
​অবকাঠামো উন্নয়ন: তিস্তা ও পদ্মা অববাহিকার যৌথ নদী কমিশনের সক্ষমতা বৃদ্ধি, সীমান্ত নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিতকরণ এবং বাঁধের ওপর রাস্তা নির্মাণের “Road-on-Embankment” মডেল অনুসরণ করা।
​উপসংহারে বলা হয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ টেকসই উন্নয়ন নির্ভর করছে নদী, কৃষি, বনায়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে একই সুতোয় বাঁধার ওপর। বৈজ্ঞানিক ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই কেবল খাদ্য, পানি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করে একটি জলবায়ু সহনশীল, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

Archives