মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৪:২০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি ও গ্যাস সংকট নিরসনে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ : লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে বাংলাদেশে নারী ও কন্যা নির্যাতন চিত্র-২০২৫ সমীক্ষা প্রতিবেদন বিষয়ক সংবাদ-সম্মেলন অনুষ্ঠিত দীর্ঘ সক্ষমতা নিয়ে আলোচনায় রিয়েলমি সি১০০আইয়ের টাইটান ব্যাটারি নান্দনিক শিক্ষাদর্শন, প্রগতিশীল নারীত্ব ও অন্ধ রক্ষণশীলতার দ্বন্দ্ব বিএনপি ৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঘোষিত মাসব্যাপী জলাশয় পরিচ্ছন্ন, মশার স্প্রে, কয়েল ও ডেঙ্গু লিফলেট বিতরণ গাছ সংরক্ষণে করণীয় বিষয়ক কর্মসূচির আয়োজন-খোয়াই রিভার ওয়াটারকিপার চলতে বছরে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর সংহিসতার তথ্য প্রকাশে ঐক্য পরিষদের সংবাদ সম্মেলন আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের বৃক্ষরোপন কর্মসূচি সদ্যবিদায়ী রাষ্ট্রপতির বিচার ও আইনি সুরক্ষা: সংবিধানের ৫১(১) অনুচ্ছেদ কি অপরাধের চিরস্থায়ী লাইসেন্স? বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড এর ৬টি বিতরণ অঞ্চল বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের ঘোষণার প্রতিবাদে বিক্ষোভ সমাবেশ

নান্দনিক শিক্ষাদর্শন, প্রগতিশীল নারীত্ব ও অন্ধ রক্ষণশীলতার দ্বন্দ্ব

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান / ৪৩ Time View
Update : সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারুস সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া); আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক।

বাংলা সংস্কৃতির চিরন্তন আবহে গান কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং তা জনজীবনের এক আত্মিক অনুঘটক। নদীমাতৃক এই ভূখণ্ডে পালতোলা নৌকার মাঝি থেকে শুরু করে প্রান্তিক কৃষক কিংবা গাড়োয়াল—সবার জীবনসংগ্রামের ক্লান্তি দূরীকরণের প্রধান অনুষঙ্গ ছিল সুর ও সংগীত। ঐতিহাসিক কালানুক্রমিকতায় এ অঞ্চলের সামাজিক কাঠামোয় নারীশিক্ষার পাশাপাশি শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগকে মার্জিত ও প্রগতিশীল ব্যক্তিত্বের মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করা হতো। সময়ের আবর্তে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থাতেও ‘আনন্দময় শিখন’ বা Joyful Learning-এর বৈশ্বিক ধারণাকে গ্রহণ করে শিশুদের শিক্ষাকে প্রাণবন্ত, অর্থবহ ও মানবিক করার প্রয়াস চালানো হচ্ছে। তবে এই প্রগতিশীল সামাজিক অগ্রযাত্রার বিপরীতে একশ্রেণির মনস্তাত্ত্বিক সংকীর্ণতা ও অন্ধ অপসংস্কৃতির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, যা আধুনিকতা ও নারীশিক্ষকের প্রাতিষ্ঠানিক স্বকীয়তার ওপর আঘাত হানতে উদ্যত।

সাম্প্রতিককালে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার পিটাইটিকর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা বিউটি রাণী পালের একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও (রিলস) কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক বিষয় নয়; বরং এটি আমাদের সামাজিক মনস্তত্ত্ব, শিক্ষাদর্শন এবং সরকারি চাকরিবিধির আইনগত ব্যাখ্যার এক জটিল সংযোগস্থল। উক্ত শিক্ষিকার সমর্থনে সারাদেশে কর্মরত বহু নারীশিক্ষক ‘আজ কেন মন উদাসী হয়ে’ গানের সঙ্গে ডিজিটাল মাধ্যমে সংহতি প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে, একদল রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী এই নান্দনিক প্রকাশকে ‘অশোভন’ হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টা চালিয়েছে। যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশাসনিক তদন্তের কথা উচ্চারিত হয়েছিল, পরবর্তীতে জেলা শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অবস্থান স্পষ্ট করে এই প্রক্রিয়ার ইতি টানা হয়েছে, যা শুভ বুদ্ধির উদয় নির্দেশ করে।

আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ কিংবা ‘সরকারি প্রতিষ্ঠানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নির্দেশিকা, ২০১৯’—কোনো আইনি দস্তাবেজেই নীতিসম্মত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বা ব্যক্তিগত শিল্পচর্চাকে নিষিদ্ধ করা হয়নি। রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা ও আইনবিজ্ঞানের মৌলিক নীতি হলো: যা সুস্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ নয়, তা বৈধ এবং ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের অংশ। যতক্ষণ না পর্যন্ত কোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের নাম বা ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে, অশালীনতা ছড়ায় বা পেশাগত দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটায়, ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষকের সৃজনশীল স্বকীয়তায় হস্তক্ষেপ করা সংবিধানপ্রদেয় বাক-স্বাধীনতা ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নীতিমালার পরিপন্থী।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে আধুনিক শিক্ষাতত্ত্ববিদ যেমন ফিনল্যান্ডের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মডেল কিংবা ইউনেস্কোর (UNESCO) নির্দেশিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষায় সংগীত, নৃত্য ও নাট্যাভিনয় হলো শিশু মনস্তত্ত্ব বিকাশের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম। শিশুকে ভয়ভীতিহীন ও আনন্দঘন পরিবেশে শিক্ষার আলো দিতে হলে শিক্ষককে সর্বাগ্রে সংস্কৃতিমনা হতে হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-4: মানসম্মত শিক্ষা এবং SDG-5: লিঙ্গ সমতা) বাস্তবায়নে নারীশিক্ষকদের এই সৃজনশীল ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে নারী উন্নয়নের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, স্বাধীনতার উত্তরকালে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নারীসমাজকে জাতীয় উন্নয়ন কাঠামোর মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে রাষ্ট্রীয় বিপ্লবের সূচনা করেছিলেন। পরবর্তীতে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী নেতৃত্বে নারীশিক্ষা অবৈতনিককরণ ও উপবৃত্তি চালুর মাধ্যমে নারী ক্ষমতায়নের যে সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, আধুনিক যুগে তারই ধারাবাহিকতায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি’র যোগ্য নেতৃত্বে নারীসমাজ তাদের পূর্ণ মর্যাদা, অধিকার ও সমঅংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার পথে অগ্রসর হচ্ছে। সুতরাং প্রগতিশীলতা ও নারী ক্ষমতায়ন এ দেশের জাতীয় রূপকল্পেরই অংশ।

অতএব, নারীকে কেবল ভোগের পণ্য মনে করা কিংবা গৃহবন্দি রাখার মতো মানসিকতা চরম মনস্তাত্ত্বিক অবক্ষয়। সংস্কৃতিমনস্ক ও আধুনিক শিক্ষিকাদের অযাচিতভাবে সামাজিক বা প্রশাসনিক কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সংস্কৃতি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষকসমাজকে যদি সৃজনশীলতাহীন, জড় ও ভীতিকর পরিবেশে বন্দি রাখা হয়, তবে জাতির মননশীল ভবিষ্যৎ রূপদান ব্যাহত হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব হলো শিক্ষকদের প্রশাসনিক ও সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করা, যাতে তারা একটি আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক ও বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থা গঠনে নিঃশঙ্কচিত্তে ভূমিকা রাখতে পারেন।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

Archives