মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৭ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
কাজী নজরুল ইসলামকে উদযাপন: সংস্কৃতি, সাহিত্য ও বাংলাদেশ-রাশিয়া সম্পর্কের এক অনন্য সন্ধ্যা ঢামেক ছাত্রদলের সোনালী ফসল মামুন শিবলীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার বনাম অবিচল দ্বায়িত্বশীলতা আগামীর বরিশাল বিভাগ : সম্ভাবনা ও করনীয় শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত শিল্পকলায় পাণ্ডুলিপি পাঠমঞ্চের তৃতীয় আসরে পাণ্ডুলিপি পাঠ করেন দেশবরেণ্য নাট্যকার ও নির্দেশক মাসুম রেজা। সোভিয়েত অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (SAAB)-এর সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা উদযাপন ফরহাদ হত্যার সঙ্গে জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি বাংলাদেশে এআই-চালিত অ্যাড নেটওয়ার্ক অ্যাডজোইক-এর যাত্রা শুরু রাশিয়ার সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এলব্রুসে উড়বে বাংলাদেশের পতাকা স্মার্টফোনে ফাস্ট চার্জিং ও রিভার্স চার্জিংয়ের সুবিধা ঢাকায় ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অফ ইয়ুথ ২০২৬’-এর প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত

ঢামেক ছাত্রদলের সোনালী ফসল মামুন শিবলীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার বনাম অবিচল দ্বায়িত্বশীলতা

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ / ১৭ Time View
Update : রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির ইতিহাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে উঠে এসেছেন বহু সংগঠক, নেতা ও পেশাজীবী। তাঁদেরই একটি প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের কৃতি সন্তান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে-৫৭ ব্যাচের সাবেক ছাত্রদল নেতা মামুন শিবলী।

সম্প্রতি তাঁকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের আলোচনা ও অভিযোগ সামনে এসেছে। কোনো কোনো পক্ষ তাঁকে সাবেক সরকারের ‘দোসর’ কিংবা কোনো রাজনৈতিক শক্তির ‘গুপ্ত সহযোগী’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। তবে এসব বিতর্কের মধ্যেই সামনে আসছে একটি মৌলিক প্রশ্ন-মামুন শিবলীর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচয় কি কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা সরকারি প্রটোকলের ব্যাখ্যার মাধ্যমে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করা যায়?

ছাত্রদলের রাজনীতিতে গৌরবময় পথচলা
মামুন শিবলীর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে তাঁর সমর্থক ও পরিচিত মহলের বক্তব্য বেশ পরিষ্কার। ঢাকা মেডিকেল কলেজে ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন।

তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়-
মিশু–রাজন কমিটিতে প্রচার সম্পাদক, ছাত্রদল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ; তাওহীদ–জাহিদ কমিটিতে সহ-সভাপতি, ছাত্রদল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ; সভাপতি, ইন্টার্নী চিকিৎসক পরিষদ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।
অর্থাৎ ছাত্রজীবনে তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ছিল প্রকাশ্য এবং সাংগঠনিক। ফলে পরবর্তী সময়ে সরকারি চাকরিতে যোগদানের কারণে তাঁর সেই রাজনৈতিক অতীত সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা কতটা যৌক্তিক-সেটিই এখন আলোচনার বিষয়।

মেধাবী শিক্ষার্থী থেকে প্রশাসন ক্যাডারে-
মামুন শিবলীর শিক্ষাজীবনও ছিল উল্লেখযোগ্য। তিনি মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও নটর ডেম কলেজে পড়াশোনা করেন এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মেধাতালিকায় স্থান করে নেন।
এরপর ৩১তম বিসিএসের মাধ্যমে তিনি প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেন। কর্মজীবনে তিনি ফরিদপুরে সহকারী কমিশনার (প্রবেশনার), শরীয়তপুরের গোসাইরহাটে সহকারী কমিশনার (ভূমি), সীমান্তবর্তী রুমায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং পরবর্তীতে ঝালকাঠিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন।

এখানেই তৈরি হয় বিতর্কের আরেকটি দিক।সরকারি দায়িত্ব পালন কি রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রমাণ?
একজন সরকারি কর্মকর্তা রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন, বিধি, সরকারি নির্দেশনা ও প্রটোকল অনুসরণ করবেন এটাই তাঁর পেশাগত দায়িত্ব। ২০১৫ সালে বিসিএস কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে সার্টিফিকেট গ্রহণ করেছিলেন মামুন শিবলী। একইভাবে তৎকালীন সরকারের নির্ধারিত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতেও একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো-একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা কি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আনুগত্যের চূড়ান্ত প্রমাণ?

প্রশাসনের একজন কর্মকর্তার সরকারি দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানকে একই মানদণ্ডে বিচার করা কতটা যৌক্তিক, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। একজন কর্মকর্তা যদি রাষ্ট্রের নির্ধারিত প্রটোকল পালন করেন, তাহলে সেটিকে সরাসরি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রমাণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে আরও নির্দিষ্ট ও প্রমাণযোগ্য তথ্যের প্রয়োজন রয়েছে।

গোসাইরহাটের ঘটনায় ভিন্ন এক চিত্র-
মামুন শিবলীর প্রশাসনিক কর্মজীবন নিয়ে তাঁর সমর্থকদের পক্ষ থেকে আরেকটি ঘটনা সামনে আনা হয়েছে শরীয়তপুরের গোসাইরহাটে তাঁর দায়িত্ব পালনের সময়কার। তাঁদের দাবি, উপজেলা চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট একজনকে দপ্তরি পদে নিয়োগ দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হলে মামুন শিবলী সরকারি নিয়ম ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা জানান। এ নিয়ে একপর্যায়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন বলেও দাবি করা হয়েছে। ঘটনাটির সরকারি নথি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য যাচাই করে এর পূর্ণাঙ্গ সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব। তবে ঘটনাটি যেভাবে তাঁর সমর্থকদের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত হয়েছে, তাতে তাঁরা এটিকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে প্রশাসনিক বিধি অনুসরণের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।

ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট-পরবর্তী সময়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনকালে আমলাতন্ত্র থেকে স্বৈরাচারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অপসারণ এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বঞ্চিত কর্মকর্তাদের সম্মান নিশ্চিত করতে তিনি সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ফ্যাসিবাদী আমলে ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে সুবিধা না পেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে পোস্টিং পাওয়ার তথ্যই প্রমাণ করে, তিনি কোনো সুবিধাভোগীর অংশ ছিলেন না।

‘স্বৈরাচারের দোসর’অভিযোগের ভিত্তি কী?
মামুন শিবলীকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’কিংবা কোনো রাজনৈতিক শক্তির ‘গুপ্ত সহযোগী’ হিসেবে আখ্যায়িত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত-সুনির্দিষ্ট প্রমাণ। কারও বিরুদ্ধে এমন গুরুতর রাজনৈতিক অভিযোগ উত্থাপনের ক্ষেত্রে সরকারি নথি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা, প্রত্যক্ষ কর্মকাণ্ড কিংবা নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ থাকা জরুরি। শুধু সরকারি অনুষ্ঠানে উপস্থিতি, রাষ্ট্রের নির্ধারিত কর্মসূচি পালন কিংবা কর্মস্থলে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ—এসব ঘটনাকে একত্র করে একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণ করা হলে তার পেশাগত বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে। অন্যদিকে, মামুন শিবলীর পক্ষ থেকে তাঁর প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন সময়ের পদায়নকে তাঁর পক্ষে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে এসব দাবিরও স্বাধীন যাচাই জরুরি।
রাজনৈতিক অতীত কি মুছে যায়? মূল প্রশ্নটি এখানেই।

একজন ব্যক্তি ছাত্রজীবনে প্রকাশ্যে ছাত্রদলের রাজনীতি করেছেন, সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং পরবর্তীতে বিসিএস দিয়ে সরকারি কর্মকর্তা হয়েছেন তাঁর সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে কি তাঁর ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক ইতিহাস মুছে যাবে? উত্তর হওয়া উচিত না।একইভাবে সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে রাষ্ট্রের নির্দেশ ও প্রটোকল পালন করলেই তাঁকে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমিচিন হবেনা।একজন মানুষের জীবনে ছাত্ররাজনীতি, পেশাগত জীবন ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থান বিষয়কে পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।

মামুন শিবলীকে নিয়ে মতভেদ থাকতে পারে। তাঁর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করার অধিকারও সবার রয়েছে। কিন্তু একজন ব্যক্তিকে ‘স্বৈরাচারের দোসর’ কিংবা ‘গুপ্ত সহযোগী’ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো গুরুতর অভিযোগ অবশ্যই যথেষ্ঠ প্রমানের প্রোয়োজনতা রয়েছে।রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা থাকতে পারে, মতাদর্শগত পার্থক্য থাকতে পারে, ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতাও থাকতে পারে-কিন্তু অর্ধসত্য, অনুমান কিংবা যাচাইহীন তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে কারও দীর্ঘ রাজনৈতিক ও পেশাগত পরিচয়কে নতুনভাবে নির্মাণ করা হলে সেটি শেষ পর্যন্ত জন-পরিসরের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। সরকারি চাকরি করা কোনো অপরাধ নয়।সরকারি প্রটোকল পালন করা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক আনুগত্যের স্বয়ংক্রিয় প্রমাণ নয়।

ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক পরিচয়ও কেবল চাকরিতে যোগ দেওয়ার কারণে ইতিহাস থেকে মুছে যায় না।
মামুন শিবলীকে নিয়ে বিতর্ক থাকুক-কিন্তু সেই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকুক তথ্য,নথি ও প্রমাণ সাপেক্ষে।কারণ প্রচারণা সাময়িকভাবে জনমত প্রভাবিত করতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের কাছে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে কেবল সত্য ও প্রমাণ।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

Archives