দেশীয় গণমাধ্যমে এআই: সম্ভাবনার দ্বারে দাঁড়িয়ে তথ্য যাচাইয়ের নতুন চ্যালেঞ্জ
তথ্য সংগ্রহ, বিশাল নথিপত্র বিশ্লেষণ, দ্রুত অনুবাদ, অডিও ট্রান্সক্রিপশন থেকে শুরু করে আকর্ষণীয় শিরোনাম তৈরি কিংবা ডেটা ভিজ্যুয়ালাইজেশন—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) সংবাদকক্ষের গতানুগতিক কাজের গতি আমূল বদলে দিচ্ছে। এমনকি অনেক ডিজিটাল নিউজ পোর্টালে এখন মানুষের সরাসরি উপস্থিতি ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবাদ প্রকাশ ও হালনাগাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কিন্তু এই সহজলভ্যতা ও গতির ভিড়ে সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি—‘তথ্য যাচাই’, ‘নির্ভুলতা’ এবং ‘সম্পাদকীয় জবাবদিহিতা’—বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও নীতিমালা-যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) ২০২৬ সালে তাদের নিউজরোক স্ট্যান্ডার্ডস আপডেট করে জানিয়েছে, গবেষণা ও প্রাথমিক খসড়ায় এআই ব্যবহার করা গেলেও চূড়ান্ত প্রকাশের আগে মানুষের নিখুঁত যাচাই বাধ্যতামূলক। একইভাবে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কন্টেন্টের সত্যতা নিশ্চিতে মেটাডেটা, স্যাটেলাইট ইমেজারি ও স্থানীয় আবহাওয়া বিশ্লেষণের মতো কৌশল প্রয়োগ করতে হচ্ছে। কারণ বর্তমানে এআই দিয়ে তৈরি নিখুঁত ভুয়া ছবি, অডিও কিংবা ভিডিও (ডিপফেক) এতই স্বাভাবিক ঠেকছে যে, কোনটা বাস্তব আর কোনটা এআই-জেনারেটেড—তা খালি চোখে চেনা কঠিন।
বাংলাদেশে এআই ও পলিসি-বাংলাদেশেও জাতীয় পর্যায়ে এআই-এর দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে নীতিমালা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে ‘ন্যাশনাল আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স পলিসি ২০২৬–২০৩০’-এর খসড়া (Draft V2.0) প্রকাশিত হয়েছে। পাশাপাশি ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার আলোচনায় ডেটা গভর্ন্যান্স ও তথ্যের সঠিকতা রক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য পাচ্ছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলোর জন্যও দ্রুত নিজস্ব এআই গাইডলাইন তৈরি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
অভিজ্ঞতার আলোকে: এআই বনাম সাংবাদিকের চোখ।এআই যতই পারদর্শী হোক না কেন, মানুষের কৌতূহল, সন্দেহ ও প্রখর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার বিকল্প প্রযুক্তি হতে পারে না। একটি বাস্তব উদাহরণের কথা বলা যাক—
দেশের ৬৪ জেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমি হস্তান্তরের পর দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে ব্যবহৃত একটি সরকারি টিকিটের দুটি বানান ভুল নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এই সরকারি নথির ভুল সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে এআই-এর কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে, এআই বারবার অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও ভুল উত্তর দিতে থাকে। পরবর্তীতে টিকিটের ছবি তুলে দেওয়া হলে এআই নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে ভুলটি চিহ্নিত করে।
এই ঘটনাটি প্রমাণ করে—এআই আত্মবিশ্বাসের সাথে ভুল তথ্য (Hallucination) পরিবেশন করতে পারে। তাই সাংবাদিকের চোখ ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের বিকল্প প্রযুক্তি এখনও তৈরি করতে পারেনি।
ঐতিহ্যগত পেশার রূপান্তর ও গণমাধ্যমের করণীয়-অতীতে যেমন সংবাদপত্রে রাজনৈতিক কার্টুন কিংবা স্বতন্ত্র ফটো এজেন্সির একটি বিশাল ঐতিহ্য ও গুরুত্ব ছিল, ডিজিটাল বিপ্লব ও এআই-এর প্রভাবে সেই কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। নতুন প্রযুক্তির আগমনে পুরোনো অনেক পেশা সংকুচিত হলেও সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব অপরিবর্তিতই থেকে যাচ্ছে।
প্রযুক্তিকে পাশ কাটিয়ে আধুনিক সংবাদমাধ্যম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। তাই এআই-কে প্রতিদ্বন্দ্বী না ভেবে সহায়কমূলক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করাই বুদ্ধিমত্তার কাজ। তবে তার জন্য কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি:
স্বচ্ছ নীতিমালা: কোন কাজে এআই ব্যবহার করা যাবে এবং কোন ক্ষেত্রে মানুষের ম্যানুয়াল ভেরিফিকেশন (Manual Verification) বাধ্যতামূলক, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা।
সচ্ছতা রক্ষা: পাঠকদের জানিয়ে দেওয়া যে সংবাদের নির্দিষ্ট কোনো অংশে প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া হয়েছে কিনা।
দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণ: তথ্যের মৌলিকতা ও সত্যতার অন্তিম দায় সবসময় সম্পাদকীয় প্যানেল ও সাংবাদিকদেরই নিতে হবে।
প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় পুঁজি হলো পাঠকের ‘আস্থা’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কাজের গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু সত্য অনুসন্ধান, নৈতিকতা ও মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখার দায়িত্ব চিরকাল সাংবাদিকদের হাতেই থাকবে।







