এমপি-দলীয় বহিষ্কার ও সংসদীয় আসন: সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের জটিলতা
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যাল (সোমালিয়া) এবং রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী আইনসভা বা জাতীয় সংসদ হলো জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার সর্বোচ্চ প্রতিফলন কেন্দ্র। সংসদ সদস্যদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব কেবল রাজনৈতিক নয়, তা আইনি ও নৈতিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য সমবায়। সম্প্রতি গণমাধ্যমে আসা সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের নীতিবহির্ভূত আচরণ ও পরবর্তীকালে তাঁর রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী’ থেকে বহিষ্কারের ঘটনাটি বাংলাদেশের সাংবিধানিক আইন ও সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রয়োগিক রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে: দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি কি তাঁর সংসদ সদস্য পদ হারাবেন?
সরকারদলীয় হুইপ, আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের ভিন্নমুখী মতামতের কারণে উদ্ভূত এই অস্পষ্টতা নিরসনে তাত্ত্বিক ও সাংবিধানিক আইনি বিশ্লেষণের আলোকে বিষয়টির নির্মোহ মূল্যায়ন আবশ্যক।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ: গঠন, উদ্দেশ্য ও প্রয়োগিক সীমারেখা
বাংলাদেশের সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ মূলত ‘দলত্যাগ বিরোধী আইন’ (Anti-defection Law) নামে পরিচিত। এই অনুচ্ছেদের মূল লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা এবং সংসদ সদস্যদের দলীয় আনুগত্য পরিবর্তনের মাধ্যমে ‘ঘোড়া কেনাবেচা’ (Horse-trading) বা অস্থিতিশীল সরকার গঠনের অপচেষ্টা বন্ধ করা।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একজন সংসদ সদস্যের পদ শূন্য হবে প্রধানত দুটি শর্তে:
যদি তিনি নিজ দল থেকে পদত্যাগ করেন।
যদি তিনি সংসদে নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট প্রদান করেন (বা দলের নির্দেশ অমান্য করে ভোটদানে অনুপস্থিত থাকেন/বিরত থাকেন)।
আইনি সুক্ষ্মতা: এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় হলো, অনুচ্ছেদ ৭০-এ বলা হয়েছে সংসদ সদস্য ‘স্বয়ং পদত্যাগ করলে’ পদ হারাবেন। দল যদি কোনো সদস্যকে নিজ থেকে ‘বহিষ্কার’ করে, তবে সংবিধানে সরাসরি সেই কারণে পদ শূন্য হওয়ার কথা উল্লেখ নেই।
অতএব, জামায়াতে ইসলামী তাঁকে বহিষ্কার করলেও তিনি নিজে সংসদ থেকে পদত্যাগ না করা পর্যন্ত কেবল ৭০ অনুচ্ছেদের দোহাই দিয়ে তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় না। সংসদীয় ইতিহাসে দেখা গেছে, দল কর্তৃক বহিষ্কৃত সদস্যরা প্রায়শই ‘স্বতন্ত্র’ (Independent) সদস্য হিসেবে সংসদে অবস্থান বজায় রাখার আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেন।
তাহলে আসন শূন্য করার অন্য কোনো সাংবিধানিক পথ আছে কি?
যদি ৭০ অনুচ্ছেদ দলীয় বহিষ্কারের ক্ষেত্রে সরাসরি পদ বাতিলের পথ সুগম না করে, তবে অন্যান্য সাংবিধানিক ধারার মাধ্যমে এই পদের নিষ্পত্তি সম্ভব:
১. অনুচ্ছেদ ৬৬(২)(ঘ) – নৈতিক স্খলন ও ফৌজদারি দণ্ড
সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোনো সংসদ সদস্য নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে (যেমন: জালিয়াতি, প্রতারণা, অপ্রাপ্তবয়স্ক যৌন নির্যাতন) অভিযুক্ত হয়ে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন এবং ন্যূনতম ২ (দুই) বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন, তবে তিনি সদস্য থাকার অযোগ্য হবেন এবং ৬৭(১)(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তাঁর আসন শূন্য হবে। (যেমনটি ঘটেছিল লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে।)
২. অনুচ্ছেদ ৬৬(৪) – স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা
যদি সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্যের অযোগ্যতা নিয়ে সংসদে বা জনপরিসরে কোনো বিতর্ক বা বিরোধ দেখা দেয়, তবে সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিষয়টি স্পিকারের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের (EC) নিকট সিদ্ধান্তের জন্য প্রেরিত হবে। নির্বাচন কমিশনের তদন্ত ও সিদ্ধান্তই এখানে চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
তাত্ত্বিক পর্যালোচনা: বার্কের ‘ট্রাস্টি মডেল’ বনাম দলীয় শাসন
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তাত্ত্বিক কাঠামোতে এডমন্ড বার্কের (Edmund Burke) ‘প্রতিনিধিত্বের তত্ত্ব’ (Trustee Model of Representation) অনুযায়ী একজন আইনপ্রণেতা কেবল দলের আজ্ঞাবহ নন, বরং তিনি সার্বিকভাবে রাষ্ট্রের জনগণের আমানতদার (Trustee)। তিনি তাঁর বিবেক ও নৈতিক মানদণ্ড অনুযায়ী পরিচালিত হবেন।
তবে বাংলাদেশের ৭০ অনুচ্ছেদ দলীয় শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে গিয়ে সংসদ সদস্যকে দলের কাছে চরমভাবে দায়বদ্ধ করেছে। আইন বিশারদদের মতে:
একপক্ষের যুক্তি: দল যখন একজন প্রার্থীকে প্রতীক দিয়ে জনগণের কাছে উপস্থাপন করে এবং জনগণ তাঁকে দলের প্রতিনিধি হিসেবে ভোট দেয়, তখন দল থেকে তাঁর বহিষ্কারের অর্থ তিনি ভোটের নৈতিক ভিত্তি হারিয়েছেন।
অন্যপক্ষের আইনি ব্যাখ্যা: সংসদীয় গণতন্ত্রে ‘দলীয় বহিষ্কার’ এবং ‘স্বচ্ছায় দলত্যাগ’ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আইনি বিষয়। দলীয় সিদ্ধান্ত দিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধির পদ বাতিল করা হলে তা ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে, যার কারণে সংবিধানে সচেতনভাবেই ‘বহিষ্কার’-কে আসন শূন্যের সরাসরি কারণ করা হয়নি।
চূড়ান্ত পর্যবেক্ষণ ও করণীয়
একটি পরিপক্ক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইন এবং নৈতিকতা হাত ধরাধরি করে চলে। আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সাময়িকভাবে পদ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও, নৈতিক মানদণ্ড হারালে সংসদীয় গণতন্ত্র তার ভিত্তি হারায়।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের এই বহুমাত্রিক সংকটে আইনি ও রাজনৈতিক করণীয় স্পষ্ট:
নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব: অপরাধমূলক কাজ, জালিয়াতি ও অসদাচরণের যে সুনির্দিষ্ট আলামত রয়েছে, তার ভিত্তিতে নিরপেক্ষ ফৌজদারি তদন্ত পরিচালনা করা।
স্পিকারের রুলিং: সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে পদটির অযোগ্যতা ত্বরান্বিত করা।
রাজনৈতিক সংস্কৃতি: সংসদীয় গণতন্ত্রকে সচল ও মর্যাদাপূর্ণ রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্বিমুখী নীতি (Double Standard) পরিহার করে দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপে সহায়তা করতে হবে।
রাজনীতিতে যখন নীতি ও আইনের ভুল ব্যাখ্যা তৈরি হয়, তখন প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয় ত্বরান্বিত হয়। সংসদীয় গণতন্ত্রের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থেই এই সাংবিধানিক প্রশ্নের একটি সুস্থ, স্বচ্ছ ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি নিষ্পত্তি হওয়া সময়ের দাবি।
লেখকঃ – প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যাল (সোমালিয়া) এবং রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক।







