জেআরপিতে স্থানীয় সংগঠনগুলোর কাছে ১% এরও কম বাজেট: প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট স্থানীয়করণ ও প্রত্যাবাসন রোডম্যাপ
রোহিঙ্গা সংকটের জন্য প্রণীত যৌথ সাড়া দান পরিকল্পনায় (JRP) মারাত্মক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে স্থানীয় ও জাতীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলো। মোট বাজেটের ১ শতাংশেরও কম বরাদ্দ পাচ্ছে তারা, যা স্থানীয়করণের বৈশ্বিক অঙ্গীকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আজ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরাম (CCNF) এবং ইকুইটিবিডি (EquityBD) এই বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে এবং রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে ১০ দফা সুপারিশ পেশ করে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৩ সালের জেআরপি বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পুরো কার্যক্রম এখনও ব্যাপকভাবে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণাধীন। মোট ৯১৮.০৮ মিলিয়ন ডলারের বাজেটের মধ্যে ৮১.৮% সরাসরি জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আন্তর্জাতিক এনজিওগুলো পাচ্ছে ৮.১৭% এবং জাতীয় এনজিওগুলো পাচ্ছে ৪.১৯%। অথচ সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, মাঠপর্যায়ে সরাসরি কাজ করা স্থানীয় এনজিওগুলোর জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ০.০৬%, যা স্থানীয় সংগঠনগুলোকে সরাসরি অর্থায়নের সুযোগ থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বঞ্চিত করার শামিল।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০টি আবেদনকারী সংস্থার কাছেই জেআরপি বাজেটের ৯১% কেন্দ্রীভূত। এর মধ্যে মাত্র ১০টি সংস্থা মোট বাজেটের ৭১% নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশেষ করে WFP (৩৪%), UNHCR (২১%), IOM (১৪%), UNICEF (১১%) এবং UNFPA (৪%) এর মতো বড় সংস্থাগুলোই মূল বাজেট ভোগ করছে। এর বিপরীতে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের (BRAC) অংশও যেকোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার তুলনায় কম।
সংগঠন দুটির মতে, বর্তমান জেআরপি কোনো পূর্ণাঙ্গ বা সমন্বিত পরিকল্পনা নয়। বাংলাদেশ সরকার এই সংকটে বিপুল আর্থিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করলেও জেআরপি কাঠামোতে তার প্রতিফলন নেই। এটি মূলত জাতিসংঘ-নির্ভর একটি তহবিল সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে স্থানীয় সরকার, জেলা প্রশাসন ও আরআরআরসি (RRRC)-এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অত্যন্ত সীমিত।
এছাড়াও ২০২৬ সালের জেআরপিতে ক্যাম্পের বাইরের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত না করায় উখিয়া ও টেকনাফে বসবাসরত স্থানীয় মানুষ চরম উপেক্ষার শিকার হচ্ছে। ক্যাম্পের বর্জ্যের কারণে প্রায় ৩০০ একর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রতিদিন ভূগর্ভস্থ থেকে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ লিটার পানি তোলার কারণে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে ১০ দফা সুপারিশ:
১. উদ্বেগ ও প্রত্যাবাসন: মানবিক সহায়তার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে।
২. ক্যাম্প নিরাপত্তা: রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনতি ঘটেছে, তা নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে ক্যাম্পের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।
৩. অধিকার নিশ্চিতকরণ: রোহিঙ্গাদের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে।
৪. রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন গঠন: বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। এই প্রক্রিয়ার যথাযথ তদারকি ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রণয়নের জন্য বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে একটি ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিশন’ গঠন করা জরুরি।
৫. জাতিসংঘের বিশেষ সম্মেলন: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করে বৈশ্বিক সমর্থন জোরদার করা প্রয়োজন।
৬. স্থানীয়দের জন্য ২৫% তহবিল: স্থানীয় জনগণ ও স্থানীয় এনজিওর জন্য রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন টিমে (RCT) অন্তত ২৫% তহবিল বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
৭. অর্থায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি: স্থানীয় এনজিওগুলোর তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়াতে এবং সরাসরি দাতাদের সাথে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করতে জেআরপিতে বিশেষ পরিকল্পনা রাখতে হবে।
৮. স্থানীয় সরকারের অংশগ্রহণ: জেআরপি প্রধান প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি, জেলা প্রশাসন ও আরআরআরসি (RRRC)-এর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে।
৯. বাজেটে স্বচ্ছতা: জেআরপি বাজেটে কার্যক্রম ব্যয়, পরিচালন ব্যয়, জনবল ব্যয় ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় পৃথকভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যেন অতিরিক্ত প্রশাসনিক ব্যয় কমিয়ে মূল অর্থ রোহিঙ্গাদের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়।
১০. পরিবেশ পুনরুদ্ধার ও নাফ নদীর পানি ব্যবহার: ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে নাফ নদীর পানি শোধন করে সরবরাহ করতে হবে। একই সাথে পরিবেশের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে একটি বিশেষ “পরিবেশ পুনরুদ্ধার তহবিল” গঠন করতে হবে।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সিসিএনএফ এবং ইকুইটিবিডি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে বাইরে রেখে এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোকে তহবিল থেকে বঞ্চিত করে এই সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধান সম্ভব নয়।






