নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বিষয়ে নারী সংসদ সদস্যদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত
আজ ১২ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের উদ্যোগে সিরডাপ মিলনায়তনে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বিষয়ে নারী সংসদ সদস্যদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত মতবিনিময় সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সম্মানিত সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান, এমপি। উপস্থিত সম্মানিত নারী সংসদ সদস্যবৃন্দের মধ্যে আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মহিলা আসন-৩৬-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য রেজেকা সুলতানা; মহিলা আসন-৩৪-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য মাধবী মারমা; মহিলা আসন-৩২-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন; মহিলা আসন-২৭-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জহরত আদিব চৌধুরী; মহিলা আসন-১৮-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য ফাহমিদা হক; মহিলা আসন-৫-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য নেওয়াজ হালিমা আরলী; মহিলা আসন-৩-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা; মহিলা আসন-১৯-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য আন্না মিনজ; মহিলা আসন-১০-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি; মহিলা আসন-০২-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা; মহিলা আসন-৩০৬-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন এবং মহিলা আসন-৩৫-এর সম্মানিত সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানা। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধান অতিথি সেলিমা রহমান, এমপিসহ সকল সংসদ সদস্যকে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আন্দোলন সম্পাদক রাবেয়া খাতুন শান্তি সংগঠনটির দীর্ঘদিনের নারীর অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের উল্লেখ করে বলেন, ১৯৭০ সাল থেকে সংগঠনটি নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন, অর্থনৈতিক মুক্তি, মানবাধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলেও রাজনীতিতে তাদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব, মূল্যায়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ এখনও সীমিত।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের পক্ষে লিখিত বক্তব্যে সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু জাতীয় সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দলের সব পর্যায়ে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান। পাশাপাশি নির্বাচনে নারীর মনোনয়ন বৃদ্ধি, নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি এবং নির্বাচনী সহিংসতা ও অর্থের অপব্যবহার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। (সংযুক্ত-০১)
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান, এমপি বলেন, নারী ইস্যুতে নারীরা এক না হলে কখনো নারীর ক্ষমতায়ন হবে না। প্রান্তিক নারীদের ক্ষমতায়নের দিকে নিয়ে আসতে হবে। নারীকে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পাশাপাশি কন্যাশিশুর প্রতি নির্যাতন বন্ধে কাজ করতে হবে। রাজনীতি মানে অবিরত সংগ্রাম করে যাওয়া। সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তৃণমূলের নারীদের ক্ষমতায়নে কাজ করতে হবে। কাজের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণে মনিটরিংয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধিতে নারীদের গুণগত সংখ্যা বৃদ্ধিসহ নারী-পুরুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
উপস্থিত অন্যান্য আলোচকবৃন্দ বলেন, নানা সংগ্রামের পর আমরা এগিয়েছি। রাজপথে দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর যেসব নারী দেশের কল্যাণে কাজ করছেন, তাঁদের সংগ্রাম পুরুষের চেয়ে অনেক বেশি। নারীদের মধ্যে কতজন যোগ্য নারী আছেন, তার প্রমাণ তাঁদের প্রতি পদে পদে দিতে হয়। এ সময় তাঁরা নারীর নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে গুণগত দিক থেকে উন্নত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। কোনো একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে সমাজ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়; নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাকে যৌথভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়। কৌশলগত পরিকল্পনা করে নারীর উন্নয়নে কাজ করতে হবে। শুধু আয়মূলক কাজ করলেই সমাজ এগোবে না; সম্পদের ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোতে নামমাত্র পদ না দিয়ে নারীকে যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের দায়িত্ব দিতে হবে।
মহিলা আসন-৩৪-এর সংসদ সদস্য মাধবী মারমা বলেন, রাঙামাটির প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারী বিবাহবিচ্ছেদের পর সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে পারেন না—এমন সমাজ এখনও আছে। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়নের কাজ শুরু করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রান্তিক স্তরে কাজ করা নারী রাজনৈতিক কর্মীদের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
মহিলা আসন-৩২-এর সংসদ সদস্য নাদিয়া পাঠান পাপন বলেন, নারীরা এখনও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন। ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে নারীরা সংরক্ষিত কক্ষের নিয়ন্ত্রণে থাকা পুরুষদের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। যুদ্ধজয়ের প্রথম সারির সৈনিক নারী হলেও তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। এমন পরিস্থিতিতে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠার কাজ অব্যাহত রাখতে হবে। সরাসরি ভোটে নারীর অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোতে ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধি রাখার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা কেন নেই, সে বিষয়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। দলমত-নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে এবং সামনের সারিতে থাকা নারী রাজনৈতিক কর্মীদের তৎপর হতে তিনি আহ্বান জানান।
মহিলা আসন-১৯-এর সংসদ সদস্য আন্না মিনজ বলেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে, তবে তা ধীরগতিতে। রাজনীতির মাঠের বাইরে যাঁরা কাজ করেন, তাঁদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে। বর্তমানে সরকারের উদ্যোগে সংরক্ষিত আসনে নারীদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বণ্টন করে দেওয়া হয়েছে এবং সমান বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। জনগণের সঙ্গে সরাসরি কাজ করার জন্য এটি নারী রাজনীতিবিদদের একটি বড় সুযোগ। এই ধারা অব্যাহত রাখতে হবে।
মহিলা আসন-১০-এর সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, ৩৩ বছর ধরে নারীরা এগিয়ে ছিলেন। তবে নারীর ক্ষমতায়ন হলো বাংলাদেশের সব নারীর ক্ষমতায়ন, যা বাস্তবে পুরোপুরি হয়নি। সৌভাগ্যবান নারী আছেন হাতেগোনা কয়েকজন। রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বে পরিবারতন্ত্রের চেয়ে তৃণমূলের সংগ্রামী কর্মীদের গুরুত্ব দিতে হবে। নারীরা যখন বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, তখন নারী রাজনৈতিক কর্মীসহ সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
মহিলা আসন-৩০৬-এর সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন বলেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধিতে কাজ করতে হবে। প্রান্তিক নারীদের উন্নয়নে এবং নির্যাতিত ও নিপীড়িত নারীদের সহায়তায় তিনি নারী রাজনৈতিক কর্মীদের কাজ করার আহ্বান জানান।
মহিলা আসন-০২-এর সংসদ সদস্য শিরীন সুলতানা বলেন, নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে এগিয়ে নিয়ে আসতে নারীশিক্ষার অগ্রগতি, বাল্যবিবাহ রোধ এবং তৃণমূল পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব বিকাশে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, নারীর জীবনে কিছু অর্জন আছে। এই অর্জন এসেছে বেগম রোকেয়া, ইলা মিত্র, হেনা দাস, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও সুফিয়া কামালের দেখানো পথে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। নারী আন্দোলন কখনো শেষ হয় না; সময় অনুসারে এর গতিপথ বদলায়। নারীর অধিকার মানবাধিকার—এটি এখনও সামাজিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে স্বীকৃত নয়। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে সংস্কৃতির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। পাশাপাশি তিনি নারী সংসদ সদস্যদের কাছে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে এ-সংক্রান্ত আলোচনা আগামী সংসদে উত্থাপনের আহ্বান জানান। সংসদের আন্দোলন ও রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে হবে। এ সময় তিনি নারী-বিদ্বেষী শক্তির বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভায় সম্মানিত নারী সংসদ সদস্যবৃন্দ, সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির প্রতিনিধিবৃন্দ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নেত্রীবৃন্দ, সম্পাদকমণ্ডলী, কর্মকর্তাগণ এবং সাংবাদিকসহ প্রায় ১৫০ জন অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিং পরিচালক জনা গোস্বামী।







