নারীর ক্ষমতায়ন, ভূমি ও কৃষিতে প্রবেশাধিকার এবং সম মজুরী নিশ্চিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরী
আন্তর্জাতিক গ্রামীণ নারী দিবস ও বিশ্ব খাদ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এন্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)-এর আয়োজনে আজ সকালে ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘ভূমি ও কৃষিতে নারী কৃষকের অধিকার এবং খাদ্য নিরাপত্তা: আমাদের করণীয়” শীর্ষক জাতীয় এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এএলআরডির চেয়ারপারসন ও নিজেরা করি’র সমন্বয়কারী খুশী কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য আন্না মিনজ এমপি। সেমিনারে আলোচনায় অংশ নেন রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশ (রিইব)-এর পরিচালক সুরাইয়া বেগম, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই)-এর উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. নাজিম উদ্দীন, বাংলাদেশ প্রাণীসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)-এর বিভাগীয় প্রধান ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড.রেজিয়া খাতুন এবং এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এএলআরডি’র উপ-নির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি। সেমিনারে বক্তারা নারীর ক্ষমতায়নে, ভূমি ও কৃষিরতে প্রবেশাধকার এবং সম মজুরীর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি বলে মনে করেন।
প্রবন্থ উপস্থাপক বলেন, খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও খাদ্য প্রাপ্যতা বা ভোগের বাস্তবতায় সবার কাছে সেই খাদ্যে পৌঁছাতে পারছে না। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থাসহ পাঁচটি সহযোগী সংস্থা কর্তৃক যৌথভাবে প্রণিত ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রায় ৩৮.৬ শতাংশ মানুষেরই স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য নেই। এটি উৎপাদন বাড়ানোর উপর নির্ভর নয় বরং খাদ্য কার হাতে, কত দামে এবং কীভাবে পৌঁছাচ্ছে এবং এর বণ্টন ও প্রাপ্যতার উপর নির্ভর। অন্যদিকে, বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ তথ্য তুলে ধরে আরো বলেন, গ্রামীণ নারীরা কৃষি শ্রমশক্তির প্রায় ৫৮ শতাংশ। অথচ এই বিপুল অংশগ্রহণ সত্ত্বেও কার্যকর ভূমি মালিকানা নারীর মাত্র ৪-৫ শতাংশ। এক্ষেত্রে রয়েছে উত্তরাধিকারে বঞ্চনা, জমির মালিকানা না থাকা, “কৃষক” হিসেবে স্বীকৃতি না থাকা ইত্যাদি। ফলে কৃষিঋণ, কৃষি সম্প্রসারণ সেবা, প্রশিক্ষণ, কৃষি কার্ড, ভর্তুকি ও প্রণোদনার তালিকা থেকে বাদ পড়েন তারা।
প্যানেল আলোচনায় সুরাইয়া বেগম বলেন, আমরা যেসমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হই, সেগুলোর ক্ষেত্রে কাঠামোগত অনেকগুলো বিষয় জড়িত। এক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থা, ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে না। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের হার বেড়ে গেছে। নারীরা এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। পুষ্টি সমৃদ্ধ খাবার থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে।
ড. নাজিম উদ্দীন বলেন, যদিও বাংলাদেশের ৬০ শতাংশ গ্রামীণ নারী কৃষি ক্ষেত্রে জড়িত, তার পরেও আমরা নারীকে কৃষক হিসেবে কল্পনা করি না। আমাদের সাংস্কৃতিক ধারায় বা চিন্তা-চেতনায় আমরা নারীকে কৃষক হিসেবে কল্পনা করার অবস্থান নেই। তিনি কৃষকের সংজ্ঞায় যারা প্রাণীসম্পদ, মৎস্য সম্পদ নিয়ে কাজ করছেন তাদেরকে কৃষক হিসেবে যুক্ত করতে হবে।
ড.রেজিয়া খাতুন বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় উৎপাদনে প্রাণিসম্পদ ক্ষেত্র ১.৯ শতাংশ ভূমিকা রাখছে। প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় নারীরা ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে অবদান রাখছে। নারীদের একটা বিশাল অংশকে আমরা মজুরীবিহীন শ্রম হিসেবেই এখনো রেখে দিয়েছি। জলবায়ু সহিষ্ণু কৃষি নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের নারী বান্ধব কৃষি প্রযুক্তি, কৃষি ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলতে হবে। কমিউনিটি ভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে কৃষি খাত, প্রাণিসম্পদ খাত এগুলোতে পরিবর্তন করতে হবে।
শামসুল হুদা বলেন, সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাংকের ২০২৬ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ২২.৫ শতাংশ। যদি এই তথ্য পুরোপুরি সত্যও হয়, তাহলে বিষয়টি উদ্বেগজনক। এই হার কমাতে হলে বিগত সরকারের সময় বন্ধ থাকা খাসজমি বিতরণ প্রক্রিয়া অবিলম্বে চালু করতে হবে। নারীদের খাসজমি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে সরকারি নীতিমালা পরিবর্তন করতে হবে। কৃষকের হাতে উন্নত মানের বীজ, নতুন প্রযুক্তি পৌছে দিতে হবে। তবে প্রযুক্তির নামে ফসলের মাঠ থেকে কৃষি মজুরকে সরিয়ে দেওয়া যাবে না। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে আমাদের জবাবদিহীতা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সদস্য এবং নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী কমিটির সদস্য আন্না মিনজ এমপি বলেন, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। সমানাধিকার, কৃষিতে স্বীকৃতির ক্ষেত্রে নারীদেরকে আরো অনেকদূর পথ হাঁটতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতায় নারীর ক্ষমতায়নের বোধের জায়গায় পরিবর্তন আনতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন, ভূমি ও কৃষিতে প্রবেশাধিকার এবং সম মজুরী নিশ্চিতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরী। বর্তমান সরকার অন্তর্ভূক্তিমূলক উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করছে। এক্ষেত্রে সকলে মিলে সরকারের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে হবে।
সভাপতির বক্তব্যে এএলআরডির চেয়ারপারসন ও নিজেরা করির সমন্বয়কর্মী মানবাধিকারকর্মী খুশী কবির বলেন,নারীরা শুধুমাত্র বাড়ির অভ্যন্তরেই কাজ করে না বরং তাঁরা বাড়ির আঙিনায় সবজি চাষ থেকে শুরু করে সরাসরি মাঠের কৃষি চাষের জড়িত। নারী যদি কৃষি ক্ষেত্রে কাজ না করে, ফসল ও শস্য বিপণনে যুক্ত না থাকে তবে খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। আমাদের দেশে শতকরা ৫৮ ভাগ নারী কৃষি ক্ষেত্রে জড়িত। অর্ধেকের বেশি জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। এ অবস্থার পরিবর্তন আনতে হলে সরকারি-বেসরকারি পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে তবেই নারী অধিকার নিশ্চিতের পথে আমরা সফলতা আনতে পারবো।
সেমিনারে তৃণমূল পর্যায়ের সাবিনা হেমব্রম, চিতকনা বেগস, নিপা আক্তার, শাহানাজ বেগম এবং মিতা রানীসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও আলোচনা অংশ নিয়ে নিন্মোক্ত দাবীগুলো তুলে ধরেন।
“কৃষক”-এর সরকারি সংজ্ঞায় নারীকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সরকারি কৃষক তালিকা ও কৃষি কার্ডে নারী কৃষকদের নাম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তর্ভুক্তকরণ নিশ্চিত করা।
কৃষি জমিতে নারীর মালিকানা নিশ্চিতকরণে খাসজমি বন্দোবস্তে নারী কৃষককে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং পারিবারিক উত্তরাধিকার আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন।
ন্যায্য মূল্য, কৃষিবিমা ও জামানতমুক্ত সহজ ঋণ নিশ্চিত করা এবং ‘নারী উৎপাদক গ্রুপ’-এর মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সরাসরি বিক্রির সুযোগ তৈরি করে কৃষিকে নারীর জন্য নিয়মিত ও ভরসাযোগ্য আয়ের উৎস করা।
ক্ষেত্রপর্যায়ে নারী কৃষি কর্মকর্তার সংখ্যা বৃদ্ধি, নারীবান্ধব উপযুক্ত প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং জলবায়ু-সহনশীল দেশীয় বীজভিত্তিক চাষাবাদে সরকারি সহায়তা প্রদান।
স্থানীয় বাজারগুলোতে নারী কৃষকদের জন্য সংগ্রহ ও বিপণন কেন্দ্র স্থাপন করে মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়া সরাসরি পণ্য বিক্রির সুযোগ সৃষ্টি করা।
সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিত করা এবং পারিবারিক কৃষিতে নারীর অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বীকৃতি প্রদান।
স্থানীয় কৃষি কমিটি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পর্ষদে নারী কৃষকের কার্যকর ও সক্রিয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
নীতি প্রণয়নের সুবিধার্থে জাতীয় পর্যায়ে নারী কৃষকের সংখ্যা, আয় ও অবদান সম্পর্কিত নিয়মিত জেন্ডার বিভাজিত উপাত্ত সংগ্রহ করা।







