ব্রাহ্ম স্কুল থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (১৮৫৮-২০০৫),জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
ব্রাহ্ম স্কুল থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (১৮৫৮-২০০৫),জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
গৌতম কুমার এদবর
ইতিহাস বিভাগ, ১৯৯৪-১৯৯৫
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসে পুরান ঢাকার বিদ্যাপীঠগুলোর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী একটি নাম। উনিশ শতকের শেষভাগে ঢাকার শিক্ষা বিস্তার ও জ্ঞানালোচনার ক্ষেত্রে যে কটি প্রতিষ্ঠান অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় তার মধ্যে অন্যতম। দীর্ঘ সংগ্রাম, আন্দোলন এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে আজকের এই স্বনামধন্য পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নিয়েছে এই প্রতিষ্ঠানটি। আমি নিজেকে ধন্য মনে করতাম এজন্য যে, আমি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেছি। আমার শিক্ষাবর্ষ ১৯৯৪-১৯৯৫, ইতিহাস বিভাগ।
ব্রাহ্ম স্কুল থেকে জগন্নাথ স্কুল প্রতিষ্ঠা (১৮৫৮-১৮৭২):
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনার ইতিহাস খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে। ১৮৫৮ সালে ঢাকা শহরের তৎকালীন সুপ্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গ—দিনানাথ সেন, প্রবীণ শিক্ষক অবিনাশ চন্দ্র সেন এবং কিশোরীলাল রায় চৌধুরী—উদ্যোগ নিয়ে ঢাকায় ‘ব্রাহ্ম স্কুল’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে আর্থিক সংকট ও নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়লে ১৮৭২ সালে এই বিদ্যালয়ের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন কলকাতার ভাক্রির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী। তিনি তাঁর পিতা, তৎকালীন সময়ের প্রখ্যাত দানবীর ও জমিদার জগন্নাথ রায় চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ১৮৭২ সালের ২৫ নভেম্বর এই প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘জগন্নাথ স্কুল’।
কলেজ স্তরে রূপান্তর ও বিকাশ (১৮৮৪-১৯০৮):
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্কুলটি স্থানীয় শিক্ষার্থীদের ইংরেজি ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করে। সময়ের চাহিদায় এর পরিধি বাড়তে থাকে। ১৮৮৪ সালে জগন্নাথ স্কুলটি কে একটি দ্বিতীয় গ্রেডের কলেজে উন্নীত করা হয়। এরপর শিক্ষার মান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে ১৯০৮ সালে এটিকে একটি প্রথম গ্রেডের কলেজে রূপান্তরিত করা হয়। এ সময় থেকেই কলেজটিতে উচ্চশিক্ষা এবং স্নাতক স্তরের পড়াশোনার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং জগন্নাথ কলেজের ভূমিকা (১৯২১):
১৯২১ সালে পূর্ববঙ্গের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ঢাকার শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এর গভীর প্রভাব পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন কাঠামোর আওতায় জগন্নাথ কলেজের ইন্টারমিডিয়েট এবং ডিগ্রি স্তরের স্নাতক পড়ানোর অনুমোদন বহাল রাখা হলেও কিছু সময়ের জন্য এর সম্মান (অনার্স) কোর্সগুলোর কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। তবে ১৯২৪ সালে কলেজটি পুনরায় ডিগ্রি ক্লাসের পূর্ণ স্বীকৃতি লাভ করে। এর দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত বা অধীন একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের শিক্ষা অঙ্গনে উজ্জ্বল ভূমিকা পালন করে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ইতিহাস পরিক্রমায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্তির বিষয়টি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় জগন্নাথ কলেজটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত (Affiliated) ছিল। তবে উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ধারায় এটি কিছু নির্দিষ্ট সময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেও পরিচালিত হয়েছিল।
নিচে এই সময়কাল ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হলো:
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে অধিভুক্তি (১৯৯২-২০০৫):
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের কলেজ শিক্ষার সার্বিক মান নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর রাজধানীসহ সারা দেশের ডিগ্রি ও সম্মান (অনার্স-মাস্টার্স) প্রদানকারী কলেজগুলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ঐতিহ্যবাহী জগন্নাথ কলেজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থানান্তরিত হয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত একটি প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা:
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকাকালীন এই কলেজটিতে বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে দিবা ও নৈশ্য কালীন শিক্ষা ব্যবস্থা চালু ছিলো। প্রায় চল্লিশ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতেন। তৎকালীন সময়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত কলেজগুলোর মধ্যে জগন্নাথ কলেজ ছিল অন্যতম সেরা ও বৃহত্তম একটি বিদ্যাপীঠ। কারণ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এতপরিমান শিক্ষার্থ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর কোথায় ছিলোনা।
পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ (২০০৫):
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিকে একটি স্বতন্ত্র ও পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করার দাবি দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সচেতন মহলের পক্ষ থেকে জোরালোভাবে উত্থাপিত হচ্ছিল। অবশেষে সেই ঐতিহাসিক দাবির বাস্তবায়ন ঘটে ২০০৫ সালে। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৫ সালের ২০শে অক্টোবর জাতীয় সংসদে ‘জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫’ পাস হয়। এই আইনের মাধ্যমে জগন্নাথ কলেজের যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্থানান্তরিত হয়। এর মাধ্যমেই জগন্নাথ কলেজ আনুষ্ঠানিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বায়ত্তশাসিত ও স্বতন্ত্র পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ব্রাহ্ম স্কুল থেকে শুরু করে আজকের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেওয়ার এই সুদীর্ঘ পথপরিক্রমাটি মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিকূলতা পেরিয়ে একেকটি ধাপ অতিক্রম করে এটি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে। শুধু শিক্ষা প্রদানই নয়, বরং ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধসহ জাতীয় জীবনের প্রতিটি গণতান্ত্রিক ও অধিকার আদায়ের আন্দোলনে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অবদান অবিস্মরণীয়। বর্তমান সময়েও দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় অত্যন্ত গৌরবময় ভূমিকা পালন করে চলেছে। আজ সেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে চলছে নানামুখি সাম্প্রদায়িক স্লোগান ও কার্যক্রম।







