সোমবার, ১৮ মে ২০২৬, ১১:৫৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
পাহাড়ে জুমের গন্ধ, মেঘের বসতি এবং একটি আত্মপরিচয়ের লড়াই ছন্দ সেন চাকমা যুক্তরাজ্যের নির্বাচনে বিজয়ী কাউন্সিলর রানা রহমানকে অভিনন্দন ​সমন্বিত পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ছাড়া বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব: জাতীয় প্রেস ক্লাবে মতবিনিময় সভা তামাক পণ্যের দাম বৃদ্ধির দাবিতে সংবাদ সম্মেলন আমানতের আর্তনাদ কঠোর ভাবে মব জাস্টিস প্রতিরোধের আহ্বান ৮০-৯০ দশক ছাত্রনেতাদের রাজস্ব আয়ের খাত নয় টেলিযোগাযোগকে সেবার খাত হিসেবে দেখার আহ্বান টিক্যাবের তেজগাঁও কলেজ ছাত্র অধিকার পরিষদের আংশিক কমিটি গঠন ​শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সেমিনার অনুষ্ঠিত শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলেই দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জিত হবে মাওলানা আব্দুল বাছিত আজাদ

পাহাড়ে জুমের গন্ধ, মেঘের বসতি এবং একটি আত্মপরিচয়ের লড়াই ছন্দ সেন চাকমা

ছন্দ সেন চাকমা / ১৬ Time View
Update : সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬

ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখলেই প্রথমে যে দৃশ্যটি ভেসে ওঠে, তা হলো—কুয়াশা মোড়ানো পাহাড়ের ঢালে এক কিশোরী জুমের ধান কাটছে, আর দূর থেকে ভেসে আসছে বাঁশির সুর। এই পাহাড়, এই অরণ্য কেবল কিছু ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক নয়; এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস, একটি যূথবদ্ধ জীবনদর্শন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ইদানীং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের স্ক্রিনে চোখ রাখলে সেই পাহাড়ের গায়ে এক ধরনের কৃত্রিম ও বিদ্বেষপূর্ণ কালির দাগ দেখতে পাই। ইতিহাস, নৃবিজ্ঞান আর মানবিক বোধকে পাশ কাটিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দাদের ‘বহিরাগত’ প্রমাণ করার এক অন্ধ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। একজন ডকুমেন্টারি নির্মাতা ও আলোকচিত্রী হিসেবে যখন আমি পাহাড়ের বুক চিরে ইতিহাসের আলো খুঁজি, তখন শব্দ বেশ ধারী রাম,শ্যাম, যদু,মধু-এর মতো চিন্তকদের লেখনী আমাদের এক পরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
​আজ সময় এসেছে রাজনৈতিক বা আবেগঘটিত চশমা সরিয়ে, সাহিত্যের খেরোখাতায় আর ইতিহাসের অমোঘ দলিলে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী বিতর্কের ব্যবচ্ছেদ করার।
​১. জুমের ঐতিহ্য ও কার্পাস মহলের আদি ইতিকথা
​ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, সমতলের রাষ্ট্রব্যবস্থা যখন আজকের এই কাঠামোগত রূপ নেয়নি, তখন থেকেই পাহাড়ের ঢালে জীবন ডানা মেলেছিল। পাহাড়ের আদিম কৃষিপদ্ধতি ‘জুম চাষ’ কেবল জীবিকা নয়, এটি পাহাড়ের ১১টি নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও মনস্তত্ত্বের মূল ভিত্তি। মোগল ও ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন দলিলে এই অঞ্চলকে অভিহিত করা হয়েছিল ‘কার্পাস মহল’ হিসেবে। তুলা আর জুমের ফসলে সমৃদ্ধ এই জনপদে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্য জাতিগোষ্ঠীগুলো গড়ে তুলেছিল নিজস্ব সামাজিক ও বিচারিক কাঠামো—যার প্রতীকী রূপ আজও টিকে আছে রাজা বা সার্কেল চিফ প্রথার মাধ্যমে।
​নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, রাষ্ট্র নামক আধুনিক ধারণার বহু আগেই এই পাহাড়ি সমাজগুলো ছিল স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং স্বাধীন। ক্যামেরা হাতে যখন আমি কোনো প্রবীণ জুমচাষির বলিরেখা পড়া মুখের ছবি তুলি, তখন মনে হয়—ঐতিহ্যের এই প্রাচীন স্বাক্ষর কোনো আধুনিক আইন দিয়ে মুছে ফেলা অসম্ভব।
​২. মাইগ্রেশনের কাঁটাতার বনাম মাটির অধিকার
​একটি বহুল চর্চিত ও খণ্ডিত যুক্তি হলো—পাহাড়ের মানুষ তো তিব্বত বা মায়ানমার থেকে এসেছে, তবে তারা ‘আদিবাসী’ হয় কী করে?
​নৃবৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক সত্যকে আড়াল করতেই এমন প্রশ্ন তোলা হয়। মানব সভ্যতার ইতিহাস মূলত স্থানান্তরেরই ইতিহাস। পৃথিবীর কোনো অঞ্চলের মানুষই ভূগর্ভ থেকে আচমকা গজিয়ে ওঠেনি। আন্তর্জাতিক আইন (ILO Convention 107 & 169) এবং নৃবিজ্ঞানের স্বীকৃত সংজ্ঞা অনুযায়ী, ‘আদিবাসী’ (Indigenous) নির্ধারণের মূল মাপকাঠি হলো—কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামো বা ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম হওয়ার আগে থেকে কারা সেখানে বসবাস করছে।
​১৭৬০ সালে ব্রিটিশরা যখন চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ নেয়, তারও বহু আগে থেকে এই জনপদ পাহাড়িদের নিজস্ব নিয়ন্ত্রণে ছিল। চাকমা রাজবংশের ইতিহাস প্রায় ১৫০০ বছরের পুরনো বলে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। ১৮৬০ সালের ‘হিল ট্র্যাক্টস’ জেলা ঘোষণা কিংবা ১৯০০ সালের ‘হিল ট্র্যাক্টস রেগুলেশন’ প্রমাণ করে যে, সমতলের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এই জনজীবন ও ভূমি-ব্যবস্থাকে ব্রিটিশ শাসকেরাও বিশেষ মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়েছিল। সুতরাং, আধুনিক বাংলাদেশের সীমানা বা মানচিত্র আঁকার বহু আগেই তারা এই মাটির সন্তান, এই পাহাড়ের ভূমি-পুত্র।
​৩. সাংবিধানিক শব্দের মারপ্যাঁচ ও আত্মপরিচয়ের সংকট
​২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে এই জনগোষ্ঠীগুলোকে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’, ‘উপজাতি’ বা ‘সম্প্রদায়’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্র হয়তো কৌশলী শব্দচয়নে তাদের ‘আদিবাসী’ পরিচয়কে পাশ কাটিয়ে গেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের নৈতিক ভিত্তি এবং মাটির ইতিহাসকে তো অস্বীকার করা যায় না।
​‘আদিবাসী’ শব্দটি কেবল একটি জাতিগত তকমা নয়; এটি তাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ভূমির অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার এবং নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার এক আন্তর্জাতিক আইনি রক্ষাকবচ। ক্যামেরার ফ্রেমে যখন লুপ্তপ্রায় কোনো ভাষার শেষ গায়কের অবয়ব ধরে রাখি, তখন বুঝি—এই আইনি সুরক্ষার অভাব কীভাবে একটি সংস্কৃতিকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দেয়। রাষ্ট্র তাদের যে নামেই ডাকুক, ইতিহাস ও ঐতিহ্য তাদের আদিবাসিত্বের পক্ষে আজীবন সাক্ষ্য দেবে।
​৪. ভার্চুয়াল জগতের বিষবাষ্প ও আমাদের দায়
​বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষদের প্রতি এক ধরনের তীব্র বিদ্বেষ ও অবমাননাকর মন্তব্য করার প্রবণতা দেখা যায়। না জেনে, না পড়ে কাউকে ‘বিদেশি’ বা ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা কেবল অজ্ঞতা নয়, বরং এক ধরনের বর্ণবাদী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ।
​একটি বৈচিত্র্যময় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্ন সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে শ্রদ্ধা জানানোই একজন সুনাগরিকের প্রথম পাঠ হওয়া উচিত। গালাগালি বা ট্রোলিং করে কোনো জাতির হাজার বছরের গৌরবময় ইতিহাসকে ফেসবুকের পাতা থেকে মুছে ফেলা যায় না। এখানে প্রয়োজন পারিবারিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক উদারতা এবং সঠিক ইতিহাস চর্চা।
​সহাবস্থানের সুর
​পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড বা পর্যটকদের বিনোদন কেন্দ্র নয়; এটি নান্দনিক সংস্কৃতির এক জীবন্ত জাদুঘর। পাহাড়, নদী, ঝরনা আর জুমের প্রতিটি ছত্রে মিশে আছে পাহাড়ের মানুষের কান্না, হাসির আর লড়াইয়ের গল্প।
​নিজের দেশের ভেতরের এই বর্ণিল বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করা মানে নিজের দেশের ইতিহাসকেই খণ্ডিত করা। প্রকৃত দেশপ্রেম ঘৃণা ছড়ানোয় নয়, বরং বৈচিত্র্যকে উদযাপনের মধ্যে নিহিত থাকে। পাহাড় ও সমতলের মাঝে দূরত্বের যে দেওয়াল তোলার চেষ্টা চলছে, তা ভাঙতে হবে পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং পরম সহিষ্ণুতার মাধ্যমে। আদিবাসীদের অধিকার ও পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেই কেবল আমরা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি। লেন্সের ওপার থেকে আমি সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের স্বপ্নই দেখি।

(লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর রীতিনীতি, পরিবেশ ও প্রতিবেশ নিয়ে কাজ করা একজন ভিডিও ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফার।)


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

Archives