পরিবর্তনশীল রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণ
৫ আগস্ট ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ ও কৌশলগত পুনর্বিন্যাস স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রপতির পদকে কেন্দ্র করে নানামুখী আলোচনা এবং দীর্ঘদিনের জোট-মহাজোটের সমীকরণ পরিবর্তনের ঘটনাপ্রবাহ দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও তাত্ত্বিক রূপরেখা নির্দেশ করে। রাজনৈতিক বিজ্ঞান ও বাস্তববাদী রাজনীতির (Realpolitik) আলোকেই মূলত এই রূপান্তর ও সমীকরণগুলোকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
১. রাষ্ট্রপতির পদ এবং সুশীল প্রচেষ্টার তাত্ত্বিক সীমাঃ
রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম আলোচনার সমান্তরালে সুশীল সমাজের একটি বিশেষ মহল ও রাজনৈতিক দলগুলোর একাংশ থেকে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও প্রস্তাব করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটি সর্বজনগ্রাহ্য জাতীয় ঐকমত্যের প্রতীক হিসেবে তাঁকে দাঁড় করানো। তাত্ত্বিকভাবে, এটি ছিল ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার একটি সুশীল উদ্যোগ। তবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থার বস্তুনিষ্ঠতা অক্ষুণ্ন রাখার তাগিদে তা আলোচনার মধ্য দিয়েই সীমাবদ্ধ থাকে। ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে তত্ত্বগত সুশীল উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর বাস্তবমুখী কাঠামোগত বোঝাপড়ার কাছে গিয়েই থামে।
২. প্রতীকী প্রতিরোধ ও কৌশলগত দর-কষাকষিঃ
জয়ের সুনির্দিষ্ট সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও জামায়াত-এনসিপি নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট কর্তৃক বীর বিক্রম কর্নেল (অব.) অলি আহমেদকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করার পেছনে গভীর রাজনৈতিক কূটকৌশল কাজ করেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘প্রতীকী প্রতিরোধ’ (Symbolic Resistance) এবং ‘নিজস্ব দর-কষাকষির ক্ষমতা প্রদর্শন’ (Bargaining Power)। এই প্রার্থিতার মাধ্যমে জোটটি মূলত নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব জাহির করা, প্রধান দলগুলোর একক আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করা এবং আগামী সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে নিজেদের কৌশলগত অবস্থান সুসংহত করার একটি মনস্তাত্ত্বিক বার্তা প্রদান করেছে।
৩. আদর্শিক বিচ্যুতি বনাম কৌশলগত আত্মরক্ষাঃ
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল অলি আহমেদের বিএনপি ত্যাগ করে জামায়াত-ঘনিষ্ঠ জোটের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামোর অন্যতম এক কৌশলগত প্যারাডক্স। বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও প্রাক্তন এই মন্ত্রীর রাজনৈতিক রূপান্তরকে কেবল আদর্শিক জায়গা থেকে মূল্যায়ন করলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এটি মূলত ক্ষমতা কাঠামোতে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখা এবং দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও উপেক্ষার ফলস্বরূপ। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির আদর্শিক অবস্থান থেকে সরে এসে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট জোটে ভেড়ার এই ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, সমকালীন বাস্তববাদী রাজনীতিতে ‘আদর্শিক অভিন্নতা’র চেয়ে ‘কৌশলগত আত্মরক্ষা’ অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
৪. রাজনৈতিক পুনর্বাসন ও অস্তিত্বের লড়াইঃ
অনুরূপভাবে, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট ফজলুর রহমানের আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে যোগদানের ঘটনাটি ক্ষমতার রাজনীতির আরেকটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। দীর্ঘকালীন এককেন্দ্রিক ক্ষমতা কাঠামো এবং দলের অভ্যন্তরীণ প্রান্তিকীকরণ অনেক ত্যাগী নেতাকে বিকল্প পথ খুঁজতে বাধ্য করে। জনাব ফজলুর রহমানের এই রূপান্তরকে রাজনৈতিক পুনর্বাসন এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার লড়াই হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, যেখানে পুরোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে নতুন পরিমণ্ডলে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই মুখ্য হয়ে ওঠে।
৫. ‘রিয়েলপলিটিক্স’ ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি নির্মাণঃ
চট্টগ্রামের জনসভায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি কর্তৃক জামায়াতকে ‘৭১-এ স্বাধীনতাবিরোধী, ৮৬-তে জাতীয় বেইমান এবং ৯৬-এ গাদ্দারি’র অভিযোগে অভিযুক্ত করা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। দুই দশক ধরে রাজনৈতিক জোটে অবস্থান করার পর এমন বক্তব্য আপাতদৃষ্টিতে স্ববিরোধী মনে হলেও, বাস্তববাদী রাজনীতির (Realpolitik) প্রেক্ষাপটে তা অত্যন্ত সঙ্গতিপূর্ণ। ক্ষমতার সমীকরণ পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের লক্ষ্যে দলগুলো নিজেদের ভাবমূর্তি পুনর্নির্মাণ করে থাকে। কৌশলগত দূরত্ব তৈরি ও আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমপি মূলত দলের নতুন রাজনৈতিক ভাবমূর্তি (Political Branding) গড়ে তোলার প্রয়াস পেয়েছেন।
৬. ধর্মীয় জনসংগঠনের প্রভাব ও কৌশলগত তোষণঃ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাটহাজারী সফর এবং হেফাজত আমির বাবুনগরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রমাণ করে যে, রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক ভোটব্যাংক এবং মাঠপর্যায়ের সংগঠিত জনশক্তি কতটা প্রভাবশালী। পূর্বে সরকারগুলো যেভাবে কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক এই শক্তিসমূহকে তোষণ বা তাদের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করেছে, বর্তমান ক্ষমতা কাঠামোতেও সেই একই ধারার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে। কওমি নেটওয়ার্কের বিশাল জনভিত্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও নির্বাচনী রাজনীতিতে বড় নিয়ামক হওয়ায় প্রধান দলগুলো কৌশলগত কারণে এদের সাথে বোঝাপড়া বজায় রাখতে বাধ্য হয়।
৭. স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার পরীক্ষাঃ
আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বিচার প্রক্রিয়া ও রাজনৈতিক পুনর্বাসনের আলোচনার মধ্যে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলটির অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশ নেওয়ার চেষ্টা একদিকে যেমন তাদের তৃণমূল পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে এটি বিরোধী শিবিরের তীব্র প্রতিরোধ ও সাধারণ জনগণের ক্ষোভের মুখোমুখি হতে পারে। যা আলটিমেটলি দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
উপসংহারঃ
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক দৃশ্যপট কোনো একক আদর্শিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং এটি প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল কৌশল, স্বার্থ ও ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর আবর্তিত হচ্ছে। দলবদল, জোট ভাঙা-গড়ার খেলা এবং একসময়ের মিত্রদের কৌশলগত শত্রুতে পরিণত হওয়ার এই প্রক্রিয়ায় জয়ী হয় কেবল বাস্তবমুখী রাজনৈতিক কৌশল। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই গণতন্ত্র, সুশাসন ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ক্ষমতার এই দ্বান্দ্বিক রাজনীতির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোই এখন রাষ্ট্রচিন্তার প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
(লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া; এবং রাজনীতি, মানবাধিকার, সুশাসন ও অপরাধ বিশ্লেষক)







