বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৩৬ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
যুক্তরাষ্ট্র এখনও উত্তর কোরিয়ার শত্রু, কেন বললেন কিমের বোন? ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার ইঙ্গিত ট্রাম্পের হীরার বাজারে নকলের ছড়াছড়ি, ক্রেতাদের পকেট কাটছে প্রতারকরা বিদায়ী বক্তব্যে কাঁদলেন মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ: একটি নির্মোহ তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় উন্নয়ন সম্ভব: হাবিবুর রশিদ হাবিব” “জনসম্পৃক্ত নদী ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা: টেকসই ভবিষ্যৎ ও যৌথ দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক সেমিনারে সাংবাদিক প্রেরণ ও প্রেস কাভারেজ প্রসঙ্গে। দশমিনায় এইচএসসি পরীক্ষায়  হল সুপার কর্তৃক এমসিকিউ উত্তর পত্র পুরন ও প্রতিস্থাপন করায় হল সুপারের বিরুদ্ধে মানববন্ধন ও শিক্ষামন্ত্রী বারাবর স্মারকলিপি পেশ যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ আইন প্রণয়নের দাবিতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

হীরার বাজারে নকলের ছড়াছড়ি, ক্রেতাদের পকেট কাটছে প্রতারকরা

এসময় ডেস্ক / ২ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

রাজধানীর শ্যামলী স্কয়ার শপিং মলে একটি গয়নার দোকানের ডায়মন্ড এসেটের ফেসবুক পেজে মাত্র ৪,৯৯৯ টাকায় নাকফুল বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। তারা একই সঙ্গে প্রতিটি নাকফুলে স্পেশাল ডিসকাউন্টসহ আকর্ষণীয় গিফটও দিচ্ছে।

এই বিজ্ঞাপনের কমেন্ট সেকশনে সাদিয়া সুলতানা নামের একজন কমেন্ট করেছেন, ‘অরিজিনাল ডায়মন্ড যদি হইতো নিয়ে নিতাম, ভয় লাগে যদি অরিজিনাল না হয়!’ এই কমেন্টের রিপ্লাইয়ে পেজ থেকে বলা হয়েছে, তাদের হীরা ১০০% প্রাকৃতিক এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বৈধভাবে সংগৃহীত।

শুধু এই একটি প্রতিষ্ঠানই নয়, দেশের নামিদামি থেকে শুরু করে সারা দেশে শত শত প্রতিষ্ঠান হীরার গয়না বিক্রি করে আসছে। কিন্তু বাংলাদেশে হীরার খনি নেই, উৎপাদনও নেই। বৈধ আমদানিও ২০১৮ সালের পর প্রায় থেমে গেছে।

বাংলাদেশের হালনাগাদ আমদানি ও রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও দেশে হীরা আমদানির পরিমাণ ছিল শূন্যের কোঠায়। অথচ ব্যবসায়ীদের হিসাবে দেশে হীরার গয়নার বাজার এখন ১১ হাজার কোটি টাকার ওপরে।

অনুসন্ধান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে হীরার বাজারের বড় অংশই অবৈধ চোরাচালানের ওপর নির্ভরশীল। আর একই সঙ্গে ল্যাবে তৈরি নকল হীরায় চলছে হাজার কোটি টাকার এই গয়নার বাজার।

খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেভাবে কম দামে হীরার গয়না বিক্রির প্রচার করছে, সেটা আদৌ সম্ভব নয়। কম দামে এসব হীরার গয়নার নামে ল্যাবে তৈরি নকল হীরার গয়না বিক্রি করছে অনেকেই। বর্তমানে ০.২ গ্রাম হীরার দাম ৮৩ হাজার টাকারও বেশি।

গত ২ এপ্রিল পাচারকালে যশোরে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকার হীরাসহ তামিলনাড়ুর এক নাগরিককে আটক করা হয়। এর আগে গত বছরের ৩০ জানুয়ারি যশোরের পাঁচভুলোট সীমান্ত এলাকা থেকে ভারত থেকে আসা প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের হীরার গয়নাসহ বাংলাদেশি হাফিজুর রহমানকে আটক করে বিজিবির একটি টহল দল।

শুধু এই দুই ঘটনাই নয়, প্রতিনিয়তই ঘটছে অবৈধ পথে হীরা চোরাচালানের ঘটনা। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন অবৈধভাবে আসা হীরার চালান বেশির ভাগ অধরাই থাকছে। আর এর নিয়ন্ত্রণে থাকা সরকারি কর্মকর্তারাই এর সুযোগ করে দিচ্ছেন।

যেভাবে বন্ধ হলো হীরা আমদানি-রপ্তানির সোনালি অধ্যায় : ২০০৭ সালে সাভারের ব্রিলিয়ান্ট হীরা লিমিটেড বেলজিয়ামে প্রথম মসৃণ হীরা রপ্তানি করে। পরে রেনেসান্স জুয়েলারি ও ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডও যোগ দেয়। ২০০৭ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হীরা থেকে মোট রপ্তানি আয় ছিল প্রায় তিন কোটি ৯৬ লাখ ডলার। সে সময় প্রতি সপ্তাহে হীরার চালান উড়োজাহাজে উঠত।

আমদানির দিকও একই—২০০৩ থেকে ২০১৮ সালে ৯৩.৫ লাখ ডলারের হীরা ও হীরার গয়না আমদানি হয়। এর মধ্যে ৮৭ শতাংশ আসে ভারত থেকে। ২০১৮ সালে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মোট এক লাখ ৪০ হাজার ডলারের হীরা আনে। এরপর আর বৈধভাবে হীরা কিংবা হীরার গয়না আমদানির রেকর্ড নেই। গত আট বছরে বৈধভাবে হীরা আমদানি হয়েছে ১০ লাখ টাকারও কম মূল্যের, তা-ও আবার শুধু শিল্প খাতের জন্য।

২০১৯ সাল থেকে রহস্য শুরু। বৈধ পথে প্রায় কিছুই আসেনি, কিন্তু বাজার বাড়তে থাকে হীরার। ডায়মন্ডের শত শত দোকান ও স্বর্ণের দোকানে হীরার গয়না বিক্রি হতে থাকে। সঠিক পরিসংখ্যান নেই, তবে ব্যবসায়ীদের সমীক্ষায় গড়ে বছরে পাঁচ হাজার কোটি টাকা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিককালে ১১ হাজার কোটি টাকার বাজারের কথা বলা হচ্ছে।

চোরাচালানই মূল উৎস : ব্যাগেজ রুলের আওতায় বিমানে করে বিদেশ থেকে হীরা আনা যায় না। বন্ড সুবিধা ছাড়া অমসৃণ হীরায় কর প্রায় ৮৯ শতাংশ, মসৃণ হীরায় প্রায় ১৫১ শতাংশ। এই উচ্চ শুল্কই অবৈধ পথের বড় কারণ। গত ২০ বছরে হীরা আমদানিতে সরকার মাত্র ১২ কোটি টাকার রাজস্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) তথ্য মতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩০ কোটি টাকার হীরা ও হীরার গয়না অবৈধভাবে দেশে ঢোকে। বছরে তা প্রায় ১০ হাজার ৯৫০ কোটি টাকা। সোনাসহ মোট চোরাচালানের পরিমাণ বছরে ৯১ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে পাচার হয়।

ভারতের সুরাট বিশ্বের সবচেয়ে বড় হীরা কাটিং-পলিশিং কেন্দ্র। সেখান থেকে সহজে বহনযোগ্য হীরা সীমান্ত দিয়ে আসে বলে ব্যবসায়ীরা ধারণা করেন। বিজিবির জব্দের ঘটনাও এর প্রমাণ। গত ২ এপ্রিল যশোরে এক ভারতীয় নাগরিকের কাছ থেকে প্রায় ছয় কোটি ৬২ লাখ টাকার হীরা (১৫৫.৭৬ গ্রাম) ও বৈদেশিক মুদ্রা জব্দ করে বিজিবি। ২০২৫ সালের ৩০ জানুয়ারি যশোরের পাঁচভুলোট সীমান্ত এলাকায় প্রায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের হীরার গয়নাসহ এক পাচারকারীকে আটক করা হয়। ২০২১ সালে সাতক্ষীরায় পৌনে দুই কোটি টাকার ১৪৪টি হীরার গয়না জব্দ হয়। অন্যান্য মাসেও বিজিবির অভিযানে হীরা জব্দের রেকর্ড রয়েছে।

নকল হীরা ও বড় কেলেঙ্কারি : আসল হীরার পাশাপাশি মোজানাইট, জারকনসহ ল্যাবে তৈরি নকল হীরা আসলের নামে বিক্রি হচ্ছে। দেশের বাজারে এক ক্যারেট বা ০.২ গ্রাম হীরার দাম ৮৩ হাজার টাকার বেশি হলেও দোকানগুলোতে পাঁচ হাজার টাকায় হীরার নাকফুল পাওয়া যায়, যা আসল হীরার ক্ষেত্রে অসম্ভব।

সলিটায়ার জ্যামোলজিক্যাল ল্যাবরেটরিজ (এসজিএল) ২০২২ সালে বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে। লন্ডন ও নিউইয়র্কে সদর দপ্তরের এই আন্তর্জাতিক ল্যাব এখনো ঢাকার বাংলামোটরে সক্রিয়। এখানে হীরা পরীক্ষা করা যায়। এখানে বিভিন্ন পরীক্ষায় আসল ও নকল দুই-ই পাওয়া যায় বলে জানা গেছে। প্রতিষ্ঠানটি আসল হীরায় সনদ নম্বর খোদাই করে দেয়।

সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারির কেন্দ্রবিন্দু ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড ও এর মালিক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা। প্রতিষ্ঠানটির দেশজুড়ে কয়েক ডজন শোরুম আছে। দৈনিক লেনদেন কোটি টাকার। অথচ বৈধ আমদানির তথ্য নেই বললেই চলে। সিআইডি ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাঁর বিরুদ্ধে ৬৭৮ কোটি টাকার মানি লন্ডারিং মামলা করে। অভিযোগ, চোরাই সোনা-হীরা কিনে অবৈধ মুনাফা ও অর্থপাচার। বৈধভাবে এলসি দিয়ে মাত্র ৩৮.৪৭ কোটি টাকার পণ্য আমদানি হয়েছে (২০০৬-২০২৪), কিন্তু স্থানীয় বাজার থেকে ৬৭৮ কোটি টাকার সোনা-হীরা সংগ্রহের কোনো বৈধ দলিল নেই।

দিলীপ আগরওয়ালা ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ ও সন্দেহজনক লেনদেনের মামলা হয়েছে। ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে মোজানাইট বা জারকনকে আসল হীরা বলে বিক্রি করার অভিযোগও দীর্ঘদিনের।

সম্প্রতি ডায়মন্ড ও স্বর্ণের তৈরি নেকলেস চুরি ও আত্মসাতের অভিযোগে বনানী থানায় করা এক মামলায় দুই নারীকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। গত ১৩ জুলাই ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সেফাতুল্লাহর আদালত এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই মোক্তার হোসেন।

গত ৮ জুলাই বনানী থানায় নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ট্রাস্টের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান এনজে ডায়মন্ডসের পক্ষে মো. খায়েজ আহাম্মদ মামলাটি দায়ের করেন। এজাহার সূত্রে জানা যায়, এনজে ডায়মন্ডসের ওই দুই নারী কর্মচারী অজ্ঞাতপরিচয় অন্যান্য সহযোগীর সঙ্গে যোগসাজশে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা অবস্থায় ২০২৪ সালের ২৭ এপ্রিল সকাল ১০টা থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই বিকেল ৫টা পর্যন্ত পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রকৃত ডায়মন্ডের অলংকারের পরিবর্তে রেপ্লিকা (নকল) অলংকার প্রতিস্থাপন করে পর্যায়ক্রমে চুরি ও আত্মসাৎ করেন।

এনজে ডায়মন্ডস কর্তৃপক্ষ জানায়, এই চক্রটি হীরা চোরাচালানের সঙ্গে অনেক আগে থেকেই জড়িত। তারা একদিকে যেমন দেশের মার্কেট থেকে চুরি করছে, একই সঙ্গে এই চক্রটি ভারত ও দুবাই থেকে হীরা চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত। তার দোকানে হওয়া চুরির ঘটনার সঠিক তদন্ত হলে এই চক্রের হোতাদের বের করা সম্ভব হবে।

বিনিয়োগের আগ্রহ ও সম্ভাবনা : ভারতের মালাবার গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস নিটল-নিলয় গ্রুপের সঙ্গে যৌথভাবে নারায়ণগঞ্জের মদনপুরে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয় ২০২২ সালে। লক্ষ্য ছিল স্বর্ণ ও হীরার গয়না তৈরি করে রপ্তানি ও স্থানীয় বাজার। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কারখানার পরিপূর্ণ কার্যক্রমের স্পষ্ট তথ্য সীমিত। মালাবার বিশ্বজুড়ে সম্প্রসারণ অব্যাহত রেখেছে।

দেশে এখন ছোট আকারের কাটিং-পলিশিং কারখানা সীমিত। নীতি-সহায়তা পেলে রপ্তানি সম্ভাবনা বিশাল। বিশ্বে মসৃণ হীরা রপ্তানির বাজার ১০ বিলিয়ন ডলারের। ভারতের দখলে বড় অংশ। বাংলাদেশে স্বর্ণের দক্ষ কারিগর রয়েছে, স্বর্ণ আমদানির জটও আগেই খুলেছে। অমসৃণ হীরায় কর কমানো, বন্ড সুবিধা সহজ করা ও রপ্তানিতে প্রণোদনা বাড়ালে খাতটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা মনে করেন।

সরকার ও নীতির চ্যালেঞ্জ : খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, হীরায় উচ্চ শুল্ক চোরাচালানকে উৎসাহিত করছে। বৈধ ব্যবসায়ীরা সংকটে পড়ছেন। রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। ক্রেতারা নকলের ফাঁদে পড়ছেন। এসজিএলের মতো ল্যাব থাকলেও সচেতনতা ও নিয়ন্ত্রণ কম।

বাজুসসহ ব্যবসায়ীরা চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা, শুল্ক যৌক্তিকীকরণ ও নীতি-সহায়তার দাবি জানিয়ে আসছেন। হীরার বাজার যদি বৈধ ও স্বচ্ছ হয়, তাহলে শুধু অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানো নয়, রপ্তানি আয়েও অবদান রাখতে পারে। বৈধ চ্যানেলে যদি হীরার আমদানি-রপ্তানি না হয়, তাহলে হাজার কোটি টাকার বাজার কীভাবে টিকে আছে? এমন প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে সীমান্ত, শুল্ক ফাঁকি ও নকল হীরায় বাজার সয়লাবের চিত্রে।

চোরাচালান ও আটক পণ্য নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরো স্বচ্ছ ও দ্রুত করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি নতুন স্থায়ী আদেশ জারি করেছে। গত সোমবার (১৭ আগস্ট) জারি করা ‘অখালাসকৃত বা চোরাচালানের অভিযোগে আটক ও বাজেয়াপ্তকৃত পণ্যের নিষ্পত্তি পদ্ধতি সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ, ২০২৬’-এ স্বর্ণ, রৌপ্য, প্লাটিনাম, হীরা, জুয়েলারি ও বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে বিশেষ নির্দেশনা রাখা হয়েছে।

এই নির্দেশনায় উল্লেখ আছে, এসব মূল্যবান পণ্যের জন্য স্বীকৃত যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সনদ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে; সনদ না পাওয়া গেলে সাময়িকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখার বিধান রয়েছে। গুদামে গ্রহণের পর পুলিশ পাহারায় জরুরি ভিত্তিতে নিকটস্থ বাংলাদেশ ব্যাংক বা ট্রেজারি ব্যাংকে পাঠাতে হবে এবং বিচারিক প্রক্রিয়া দুই মাসের মধ্যে শেষ না হলে সেগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিতে হবে। এই আদেশ কার্যকর হলে সীমান্তে জব্দ হওয়া হীরার চালানসহ মূল্যবান রত্নের নিষ্পত্তি আরো নিয়ন্ত্রিত ও স্বচ্ছ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

কী বলছে বাজুস ও অ্যাসোসিয়েশন? : বাংলাদেশ জুয়েলারি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) মুখপাত্র আনোয়ার হোসেন বলেন, বৈধ চ্যানেলে আমদানি না হওয়া সত্ত্বেও বাজারে পণ্য থাকাটা ব্যাবসায়িক সততার জন্য একটি বড় বাধা। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এই অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি।

দেশের বাজারে ডায়মন্ড বা হীরার অস্বাভাবিক সরবরাহ এবং স্বর্ণের দামের অস্থিরতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আনোয়ার হোসেন বলেন, ২০১৮ সালের পর থেকে দেশে বৈধ পথে হীরা আমদানির কোনো উল্লেখযোগ্য তথ্য নেই, অথচ বাজারে হীরার পণ্যের অভাব নেই। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, হীরা অবৈধ পথে দেশে প্রবেশ করছে।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ব্যবসায়ী হিসেবে চাই না যে স্মাগলিংয়ের মাধ্যমে পণ্য আসুক। সাধারণ মানুষ যাতে প্রতারিত না হয় এবং সঠিক জিনিস পায়, সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’

বাজারে নকল বা ল্যাবে তৈরি হীরাকে আসল হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিয়েও তিনি সতর্ক করেন। আনোয়ার হোসেন পরামর্শ দেন, বিক্রেতাদের অবশ্যই বৈধ সার্টিফিকেটসহ আসল পণ্য বিক্রি করা উচিত এবং ক্রেতাদেরও যাচাই করে সার্টিফিকেট নিশ্চিত হয়ে কেনা উচিত। তিনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো যথাযথ কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে নিয়মিত মনিটরিং করার আহবান জানান, যাতে সাধারণ মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়। দেশের বর্তমান জুয়েলারি ব্যবসার অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে এই শিল্প একটি নাজুক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে স্বর্ণের দামের অত্যধিক ওঠানামার কারণে সাধারণ ক্রেতারা গয়না কেনা কমিয়ে দিয়েছেন।’

তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি খুব একটা শক্তিশালী না হওয়ায় দাম কমার আশায় মানুষ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে, যার ফলে শৌখিন কেনাকাটা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

ব্যাবসায়িক এই মন্দার পেছনে বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাব তুলে ধরে তিনি বলেন, দুই-তিন বছর ধরে এই সমস্যা চললেও সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিশেষ করে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা এবং তেলের দামের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তেলের ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক সভ্যতা ও ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালিত হওয়ায় এর প্রভাব সরাসরি হীরা ও স্বর্ণের বাজারে পড়ছে এবং ব্যাংকসহ বিভিন্ন খাতেও এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

Archives