শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৫:১৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও নান্দনিকতা: ভিসি-দের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও পোশাকের সামাজিক প্রভাব উল্টো রথযাত্রা উদযাপন-ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে স্বামীবাগ ইসকন মন্দির দিল্লীতে ছাত্র-আন্দোলন বাংলাদেশের মত ভুলপথে যাবেনা তো? রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও রাজনীতির সমীকরণ: প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা ইতিহাসে প্রথমবার, নিজেদের মাঠেই ‘অতিথি’ ভারত নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভের মুখে শিক্ষা সচিব বদলি, অনশন ভাঙলেন সোনাম ওয়াংচুক শতবর্ষী বিশ্বকাপের ফাইনাল নিজেদের ঘরে আনতে মরক্কোর বিশাল প্রস্তুতি মধ্যপ্রাচ্য সংকটে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ স্পিকার দেশে ফিরলেই রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিখোঁজের ২ দিন পর জঙ্গল থেকে যুবকের লাশ উদ্ধার। নেপথ্যে পুলিশ ও সাংবাদিকদের যৌথ তৎপরতা

বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব ও নান্দনিকতা: ভিসি-দের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও পোশাকের সামাজিক প্রভাব

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান / ৩৫ Time View
Update : শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

প্রফেসর ড. আসিফ মিজান উপাচার্য, দারুল সালাম বিশ্ববিদ্যালয় (সোমালিয়া); আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মানবাধিকার ও অপরাধ বিশ্লেষক।

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র নয়, বরং তা একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু। আর এই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ অভিভাবক অর্থাৎ ভাইস চ্যান্সেলর বা উপাচার্য (VC) হলেন একাডেমিয়া ও সুশীল সমাজের এক অনন্য বাতিঘর। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও উচ্চশিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক আচরণবিধি (Institutional Sociology and Non-verbal Communication) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এক একজন উপাচার্যের চালচলন, বাচনভঙ্গি, অঙ্গভঙ্গি (Body Language) এবং পোশাক-আশাক (Executive Attire) কেবল তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় নয়; তা হলো পুরো একাডেমিয়ার নেতৃত্ব, সততা ও অভিক্ষিপ্ত ভাবমূর্তির (Projected Image) এক দৃশ্যমান সনদ।

বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের এই প্রফেশনালিজম বা পেশাদারিত্বের অভাব ও নান্দনিক দৃষ্টিভঙ্গির দীনতা আজ গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন। একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদ ও উপাচার্য হিসেবে বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা আমি আমার সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করি।

প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্ব ও নান্দনিকতার তাত্ত্বিক ভিত্তি

সমাজবিজ্ঞানী আর্ভিং গফম্যানের (Erving Goffman) বিখ্যাত ‘ড্রেমাটার্জিক্যাল থিওরি’ (Dramaturgical Theory) অনুযায়ী, সমাজে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তি যখন জনসাধারণের সামনে আসেন, তখন তিনি এক ধরনের ‘ফ্রন্ট স্টেজ’ (Front Stage) পারফর্ম করেন। উপাচার্যের পদটি অত্যন্ত সম্মানিত ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি অবস্থান। একজন উপাচার্য যখন ছাত্র-শিক্ষক, গবেষক, নাগরিক সমাজ বা বৈশ্বিক ডেলিপেশনের সামনে দাঁড়ান, তখন তাঁর নন-ভার্বাল কমিউনিকেশন (অবাচিক যোগাযোগ) প্রথম প্রভাব তৈরি করে।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আজকাল বাংলাদেশের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের দৈহিক ভাবভঙ্গি এবং পোশাক রীতির মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক গাম্ভীর্যের প্রচণ্ড ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। অনেক সময় তাঁদের কথাবার্তা, শারীরিক ভাবভঙ্গি বা পোশাক নির্বাচনে পেশাদারিত্বের চেয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্রতিনিধি বা ঠিকাদারি কাঠামোর আচরণ ফুটে ওঠে, যা উচ্চশিক্ষার নান্দনিকতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করে। স্বকীয় ব্যক্তিত্ব ও আত্মবিশ্বাসের এই অভাব তরুণ শিক্ষার্থী ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ভুল বার্তা পাঠায়।

ঐতিহ্য, আধুনিকতা ও আন্তর্জাতিক রূপরেখা: প্রথাগত গাউন থেকে ‘স্মার্ট ক্যাজুয়াল’

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে একাডেমিক নেতৃত্বের পোশাক দুটি ধারায় বিভক্ত—প্রথাগত আনুষ্ঠানিকতা এবং আধুনিক কর্মীবান্ধব স্বাচ্ছন্দ্য।

১. প্রথাগত রাজকীয় পোশাক (Formal/Academic Regalia): সমাবর্তন, আন্তর্জাতিক সিম্পোজিয়াম বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্মেলনে গাউন, স্যুট-টাই বা সুনির্দিষ্ট ঐতিহ্যবাহী পোশাক একজন উপাচার্যের গাম্ভীর্য ধরে রাখে। এটি প্রতিষ্ঠানটির কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্যকে ধারণ করে।

২. আধুনিক স্মার্ট ক্যাজুয়াল (Smart Casual): সিলিকন ভ্যালি থেকে শুরু করে কেমব্রিজ বা হার্ভার্ডের মতো বৈশ্বিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ অভিভাবকরা দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে অতিরিক্ত আড়ম্বর এড়িয়ে ‘স্মার্ট ক্যাজুয়াল’ স্টাইল গ্রহণ করেছেন।

একটি আধুনিক ও কার্যকরী ‘ড্রেস কোড’-এর মূল উপাদানগুলো হলো:

ব্লেজার ও শার্ট: কলারযুক্ত ক্যাজুয়াল শার্ট বা পলোর ওপর সূক্ষ্ম ব্লেজার বা জ্যাকেট, যা একই সাথে পেশাদার ও প্রবেশযোগ্য (Accessible) ভাব তৈরি করে।

প্যাটাগোনিয়া ভেস্ট (Patagonia Vest): আধুনিক একাডেমিক ও কর্পোরেট লিডারশিপে এখন হালকা বা ডার্ক কালারের প্যাটাগোনিয়া ভেস্ট অত্যন্ত জনপ্রিয়, যা কাজের প্রতি মনোযোগ ও গতিশীলতার প্রতীক।

ফিটেড ট্রাউজার্স ও মার্জিত জুতো: ডার্ক ডেনিম বা চিনোসের সাথে মানানসই লেদার লোফার কিংবা পরিচ্ছন্ন স্নিকার্স পরার এই বিশ্বজনীন সংস্কৃতি কেবল স্বাচ্ছন্দ্য আনে না, শিক্ষার্থীদের সাথে এক ধরনের সংযোগও তৈরি করে।

নারী উপাচার্যদের ক্ষেত্রে: সুমার্জিত ব্লেজার, ট্রাউজার বা স্থানীয় ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ শালীন ও প্রাতিষ্ঠানিক পোশাক, যা একই সাথে কর্তৃত্ব ও আভিজাত্য প্রকাশ করে।

এগুলোর মূল লক্ষ্য একটিই—“আমি কাজের জন্য প্রস্তুত, আমি গম্ভীর কিন্তু আমি অগম্য নই।”

বডি ল্যাঙ্গুয়েজ ও মনস্তাত্ত্বিক সিগন্যালিং

পোশাকের চেয়েও বেশি শক্তিশালী হলো শরীরের ভাষা বা ‘নন-ভার্বাল সিগন্যালিং’। গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো মানুষ আমাদের সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি করে, তার ৫৫% নির্ভর করে শারীরিক ভাষার ওপর। একজন দক্ষ উপাচার্যের বডি ল্যাঙ্গুয়েজের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত:

উন্মুক্ত ভঙ্গি (Open Posture): আলোচনা বা মিটিংয়ে বুক চাপড়ে বা হাত বেঁধে না বসে টেবিলের ওপর খোলা রাখা। এটি খোলামেলা মানসিকতা ও গ্রহণের সক্ষমতা দর্শায়।

দৃঢ় আই কনট্যাক্ট ও আত্মবিশ্বাস: চোখের যোগাযোগ এড়িয়ে যাওয়া দুর্বল আত্মবিশ্বাসের লক্ষণ। একজন উপাচার্য যখন শিক্ষার্থীদের কথা শোনেন, তখন মৃদু মস্তক সঞ্চালন (Nodding) এবং মনোযোগ দিয়ে সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে বসা (Leaning Forward) প্রমান করে যে তিনি তাঁদের মূল্যায়ন করছেন।

সংযম ও মনোযোগ (Active Observation): অযাচিত কথা না বলে গম্ভীর নীরবতা ও নোট নেওয়ার অভ্যাস উপাচার্যের বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতাকে প্রকাশ করে।

বাংলাদেশে অনেক সময় এই সূক্ষ্ম বিষয়গুলোর অভাব দেখা যায়। অতিরিক্ত হাত নেড়ে আঞ্চলিক ঢঙে কথা বলা, উচ্চ শব্দে হাসাহাসি বা শিক্ষার্থীদের সামনে আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকা—এসবই উপাচার্যের আসনকে সাধারণ স্তরে নামিয়ে আনে।

সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট: বাংলাদেশ বনাম বিশ্ব

পশ্চিমা বিশ্বে উপাচার্যদের বিচার করা হয় তাঁদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা, গবেষণার পরিবেশ তৈরি এবং শিক্ষার্থীবান্ধব আচরণের ওপর ভিত্তি করে। সেখানে পোশাক ও বডি ল্যাঙ্গুয়েজে থাকে আত্মবিশ্বাস ও বিনয়ের এক অপূর্ব মিশ্রণ।

পক্ষান্তরে, দক্ষিণ এশিয়ায়- বিশেষ করে বাংলাদেশে- উপশাসনীয় মানসিকতা (Colonial Mentality) থেকে আমরা এখনো পুরোপুরি বের হতে পারিনি। একদিকে আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক একাডেমিক শিষ্টাচারের অভাব- এই দ্বৈত সংকটে বিশ্বমানের একাডেমিয়া হিসেবে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে পড়ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। একজন উপাচার্য যখন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কিংবা বিদেশী প্রতিনিধিদের সাথে বসেন, তখন তাঁর আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি জাতীয় ভাবমূর্তিকে সংকুচিত করে।

উত্তরণের উপায়: প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার

এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ স্পষ্ট। উপাচার্য পদটি কেবল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের জায়গা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্ব।

১. প্রফেশনাল লিডারশিপ ট্রেনিং (Professional Leadership Orientation): উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে উপাচার্য পদে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তাঁদের জন্য ‘একাডেমিক এক্সিকিউটিভ ড্রেস-কোড’, ‘কূটনৈতিক শিষ্টাচার (Diplomatic Etiquette)’, এবং ‘মিডিয়া ও পাবলিক স্পিকিং’-এর ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা জরুরি।

২. আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চর্চা: আধুনিক যুগের ভাইস চ্যান্সেলরদের জানতে হবে কীভাবে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজে ‘স্মার্ট ক্যাজুয়াল’ বজায় রেখেও আভিজাত্য ধরে রাখা যায় এবং গম্ভীর অনুষ্ঠানে ঐতিহ্য রক্ষা করা যায়।

৩. সোশ্যাল মিডিয়া ও ডিজিটাল উপস্থিতি: ইন্টারনেটের এই যুগে উপাচার্যদের প্রতিটি চালচলন নাগরিক ও সুশীল সমাজের নজরে থাকে। তাই অঙ্গভঙ্গিতে কোনো প্রকার অনভিজ্ঞতার ছাপ যেন না থাকে, সে বিষয়ে নিজেদের সচেতন হতে হবে।

অতএব, সংশ্লিষ্টদের মনে রাখতে হবে উপাচার্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আত্মা। তাঁর ব্যক্তিত্ব, বাচনভঙ্গি এবং বাহ্যিক রূপই পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও মানদণ্ড নির্ধারণ করে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার একজন বিশ্লেষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি- বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে আন্তর্জাতিক মানের করতে হলে কেবল পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়ন নয়, বরং উপাচার্যদের ব্যক্তিসত্তা ও নেতৃত্বের নান্দনিকতায় আমূল পরিবর্তন আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। একজন যোগ্য, আত্মবিশ্বাসী এবং মার্জিত উপাচার্যই পারেন একটি পুরো প্রজন্মকে বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা যোগাতে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

এক ক্লিকে বিভাগের খবর

Archives